ছুটির দিনেও দূষণে শীর্ষে ঢাকা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১০ বার
ঢাকার বায়ুদূষণ পরিস্থিতি আজ

প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ছুটির দিন সাধারণত নগরজীবনে কিছুটা স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসে। যানজট কমে, শিল্পকারখানার কার্যক্রম আংশিক থেমে যায়, আর মানুষ আশা করে অন্তত বাতাসটা কিছুটা স্বচ্ছ হবে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। শুক্রবার সকালেও রাজধানীর বাতাস ছিল বিপজ্জনক মাত্রায় দূষিত, যা নগরবাসীর জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণ সংস্থা IQAir–এর সর্বশেষ সূচকে দেখা গেছে, বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করেছে লাহোর এবং দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ঢাকা।

শুক্রবার সকাল ৯টা ২০ মিনিটে প্রকাশিত সূচক অনুযায়ী লাহোরের বায়ুগুণমান সূচক ছিল ৪০৬, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সরাসরি ‘দুর্যোগপূর্ণ’ হিসেবে বিবেচিত। একই সময়ে ঢাকার স্কোর ছিল ৩২২, অর্থাৎ এখানকার বাতাসও একইভাবে বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছেছে। বায়ু দূষণের এই মাত্রা শুধু অস্বস্তিকর নয়, বরং স্বাস্থ্যঝুঁকির দিক থেকে তাৎক্ষণিক সতর্কতা জারি করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের সূচক দীর্ঘ সময় স্থায়ী হলে তা শ্বাসতন্ত্র, হৃদ্‌রোগ এবং শিশুদের শারীরিক বিকাশে গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।

তালিকার তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত কলকাতা, যার স্কোর ২১২। এই মাত্রাকে ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। চতুর্থ স্থানে থাকা দিল্লি-র স্কোর ২০৮, যা একইভাবে উচ্চমাত্রার স্বাস্থ্যঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়। পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের শহর দোহা, যার স্কোর ১৬৩—এটিও অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার বড় শহরগুলোতে বায়ুদূষণ দীর্ঘদিন ধরেই একটি জটিল পরিবেশগত সংকট হিসেবে বিদ্যমান। দ্রুত নগরায়ণ, নির্মাণকাজের ধুলো, পুরোনো যানবাহনের ধোঁয়া, নিম্নমানের জ্বালানি এবং শীত মৌসুমে বায়ুপ্রবাহ কমে যাওয়ার মতো কারণগুলো একত্রে দূষণের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে শীতের শেষভাগে বাতাসের স্থিরতা বাড়ে, ফলে দূষিত কণাগুলো দীর্ঘ সময় বাতাসে ভেসে থাকে এবং মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করে।

চিকিৎসকরা বলছেন, বায়ুমানের সূচক যখন ৩০০-এর ওপরে ওঠে তখন তা কেবল সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য নয়, সুস্থ মানুষের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। শিশু, বয়স্ক এবং দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্ট বা হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। এই পরিস্থিতিতে অপ্রয়োজনীয় বাইরে যাওয়া কমানো, মাস্ক ব্যবহার করা এবং ঘরের ভেতরে বায়ু পরিশোধক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

পরিবেশবিদদের মতে, ঢাকার দূষণের অন্যতম বড় উৎস নির্মাণকাজের ধুলা ও যানবাহনের কালো ধোঁয়া। রাজধানীতে প্রতিদিন হাজার হাজার যান চলাচল করে, যার বড় অংশই পুরোনো প্রযুক্তির ইঞ্জিন ব্যবহার করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ইটভাটা, শিল্পকারখানা ও বর্জ্য পোড়ানোর ধোঁয়া। তারা মনে করেন, দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর আইন থাকলেও বাস্তব প্রয়োগের ঘাটতি সমস্যাকে দীর্ঘস্থায়ী করছে। নিয়মিত মনিটরিং ও কঠোর জরিমানা ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি কঠিন।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, বায়ুদূষণ কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাও। দূষণের কারণে অসুস্থতা বাড়লে কর্মক্ষমতা কমে যায়, স্বাস্থ্যব্যয় বাড়ে এবং জাতীয় উৎপাদনশীলতা কমে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশ্বব্যাপী গবেষণায় দেখা গেছে, দূষিত বাতাসে দীর্ঘদিন বসবাস করলে আয়ু কমে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বায়ুগুণমান সূচক শূন্য থেকে ৫০ হলে সেটিকে ভালো ধরা হয়, ৫১ থেকে ১০০ হলে মাঝারি, ১০১ থেকে ১৫০ হলে সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর এবং ১৫১ থেকে ২০০ হলে সাধারণ মানুষের জন্যও অস্বাস্থ্যকর। ২০১ থেকে ৩০০ হলে তা খুব অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচিত হয়, আর ৩০১-এর ওপরে গেলে সেটিকে দুর্যোগপূর্ণ বলা হয়। ঢাকার বর্তমান স্কোর সেই সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ স্তরেই অবস্থান করছে, যা নগরবাসীর জন্য সতর্কবার্তা।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দূষণ কমাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নগর পরিকল্পনায় সবুজ এলাকা বাড়ানো, গণপরিবহন উন্নত করা, পুরোনো যানবাহন অপসারণ এবং শিল্পকারখানায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা—এসব পদক্ষেপ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি নাগরিকদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়ানো জরুরি, কারণ ব্যক্তিগত আচরণও দূষণ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।

সামাজিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে বায়ুদূষণ এখন জনস্বাস্থ্যের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। প্রতিদিন লাখো মানুষ কর্মস্থলে যেতে বাধ্য হন, শিশুদের স্কুলে যেতে হয়, শ্রমজীবীদের খোলা আকাশের নিচে কাজ করতে হয়—এদের জন্য দূষণ এড়িয়ে চলা প্রায় অসম্ভব। ফলে দূষণ কমানোর দায়িত্ব শুধু ব্যক্তির নয়; এটি রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকদেরও সমান দায়িত্ব।

পরিবেশ অধিকারকর্মীরা মনে করেন, দূষণ নিয়ন্ত্রণে সফল হতে হলে শুধু জরুরি ব্যবস্থা নয়, ধারাবাহিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক নীতি প্রণয়ন করতে হবে। তারা উদাহরণ হিসেবে বিভিন্ন দেশের শহরের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে কয়েক দশকের মধ্যে দূষণের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হয়েছে। তাদের মতে, একই ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করলে ঢাকাও ধীরে ধীরে দূষণমুক্ত হতে পারে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ছুটির দিনেও যখন রাজধানীর বাতাস দুর্যোগপূর্ণ থাকে, তখন তা কেবল একটি দিনের সমস্যা নয়; বরং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার ফলাফল। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং নাগরিক সচেতনতার সমন্বয়। অন্যথায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ নগর পরিবেশ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত