প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সংঘাত ও হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তাজটিলতার কারণে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো নতুন করে সারচার্জ আরোপ করেছে। এর প্রভাব পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যগামী বাংলাদেশের আমদানি–রপ্তানি পণ্য পরিবহনেও। বিশেষত ইরান, ইরাক, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্য চলাচলে এই অতিরিক্ত খরচ চাপ সৃষ্টি করছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরানি বাহিনী হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেয়। এর ফলে বেশিরভাগ শিপিং কোম্পানি মধ্যপ্রাচ্যগামী নতুন বুকিং বন্ধ করে দেয়। তবে সমুদ্রপথে ইতিমধ্যে চলমান যেসব কনটেইনার ও জাহাজ বন্দরে আটকা রয়েছে, তার জন্যও অতিরিক্ত সারচার্জ দিতে হবে। শিপিং কোম্পানিগুলোর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নোটিশ অনুযায়ী, প্রতি একক কনটেইনারে সর্বনিম্ন ৮০০ ডলার থেকে সর্বোচ্চ ২ হাজার ডলার পর্যন্ত সারচার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে। বড় হিমায়িত কনটেইনারে এই মাশুল চার হাজার ডলার পর্যন্ত উঠেছে। সাধারণত একটি কনটেইনারে ১৪ টন ও বড় কনটেইনারে ২৮ টন বা তার বেশি পণ্য পরিবহন করা যায়।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক ও মেডিটেরানিয়ান শিপিং কোম্পানির হেড অব অপারেশন আজমীর হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, সংঘাত ও নিরাপত্তাজটিলতার কারণে জাহাজগুলো লোহিত সাগর ঘুরে ইউরোপ–আমেরিকায় পৌঁছাচ্ছে। এতে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাচ্ছে এবং পরিবহন খরচও আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যগামী কনটেইনার পরিবহনে বাংলাদেশসহ সব দেশের চালানের ওপরই শিপিং কোম্পানিগুলো সারচার্জ আরোপ করেছে। সমুদ্রে আটকে থাকা বা ট্রানশিপমেন্ট বন্দরে থাকা কনটেইনারেও এই অতিরিক্ত খরচ প্রযোজ্য।”
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৫৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে চারটি বড় আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি। এগুলো হলো ডেনমার্কের মায়ের্সক লাইন, সুইজারল্যান্ডের মেডিটেরানিয়ান শিপিং কোম্পানি, ফ্রান্সের সিএমএ–সিজিএম ও জার্মানির হ্যাপাগ–লয়েড। যদিও বাংলাদেশে কনটেইনারবাহী জাহাজ রয়েছে, নিজস্ব পরিবহন কোম্পানি নেই।
ফ্রান্সভিত্তিক সিএমএ–সিজিএম ৩ মার্চ তাদের ওয়েবসাইটে ঘোষণা দিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের ১৩ দেশে পণ্য পরিবহনে ‘ইমার্জেন্সি কনফ্লিক্ট সারচার্জ’ আরোপ করা হয়েছে, যা ২ মার্চ থেকে কার্যকর। মেডিটেরানিয়ান শিপিং কোম্পানি আরব উপসাগরমুখী চালানে প্রতি কনটেইনারে ৮০০ ডলার সারচার্জ আরোপ করেছে। মায়ের্সক লাইন সাতটি উপসাগরীয় দেশে প্রতি কনটেইনারে ১ হাজার ৮০০ ডলার জরুরি ভাড়া ঘোষণা করেছে। হ্যাপাগ–লয়েড প্রতি কনটেইনারে ১ হাজার ৫০০ ডলার যুদ্ধঝুঁকি সারচার্জ আরোপ করেছে।
শিপিং কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, সমুদ্রে আটকে থাকা আরব উপসাগরমুখী জাহাজগুলো নিরাপদ বন্দরে খালাস করা হবে। এতে যে অতিরিক্ত খরচ হবে, তা মেটাতেই সারচার্জ আরোপ করা হয়েছে। এ ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যের বন্দরে আটকে থাকা কনটেইনারেও একইভাবে অতিরিক্ত ভাড়া দিতে হবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে মধ্যপ্রাচ্যের সাত দেশ থেকে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে। একই সময়ে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৭৫ কোটি ডলারের পণ্য। আমদানির বড় অংশ জ্বালানি, সার ও খনিজ হলেও অন্যান্য অনেক পণ্য কনটেইনারে পরিবহন করা হয়। বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, শাকসবজি, ফলমূল, হিমায়িত মাছ, ক্যাপ ও জুতা রপ্তানি হয়। অন্যদিকে প্লাস্টিক শিল্পের কাঁচামালসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি হয়।
উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, এখন আমদানি–রপ্তানি পণ্যের পরিবহন অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। সারচার্জের কারণে ব্যবসায়িক চাপ আরও বাড়বে। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ঝুঁকি, জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি ও বিকল্প পথ সীমিত হওয়ায় ভবিষ্যতে পণ্য পরিবহনের খরচ আরও বাড়তে পারে। তারা সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে বিকল্প উপায় খুঁজে বের করারও পরামর্শ দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ স্থায়ী হলে মধ্যপ্রাচ্যগামী বাংলাদেশের পণ্য পরিবহন ও খরচ নিয়ন্ত্রণে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। সমুদ্রপথে অতিরিক্ত সারচার্জ এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে আমদানি–রপ্তানি খাতের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়তে পারে।