প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ফুটবলের ইতিহাসে কিছু জার্সি শুধুমাত্র একটি নম্বর নয়, বরং একটি ঐতিহ্য, একটি উত্তরাধিকার এবং একটি জাতির গর্বের প্রতীক। ব্রাজিল জাতীয় ফুটবল দলের ১০ নম্বর জার্সি ঠিক তেমনই একটি প্রতীক, যা বছরের পর বছর ধরে বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের কাঁধে শোভা পেয়েছে। সেই জার্সির ইতিহাসে এবার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যোগ করলেন নেইমার জুনিয়র। দীর্ঘ ৯৮১ দিনের অপেক্ষার পর জাতীয় দলে ফিরে এসে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের দুই কিংবদন্তি পেলে ও রিভালদোর পাশে নিজের নাম লিখিয়েছেন এই তারকা ফরোয়ার্ড।
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে বদলি হিসেবে মাঠে নামেন নেইমার। প্রথম দুই ম্যাচে মাঠের বাইরে থাকা এই তারকার জন্য এটি ছিল শুধু একটি প্রত্যাবর্তনের ম্যাচ নয়; বরং ব্যক্তিগত ও ঐতিহাসিক অর্জনেরও এক বিশেষ মুহূর্ত। মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে ৭৫তম মিনিটে ম্যাথিউস কুনহার পরিবর্তে মাঠে নামার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি স্পর্শ করেন একটি অনন্য মাইলফলক।
বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সি পরে এটি ছিল নেইমারের ১৪তম ম্যাচ। এর মাধ্যমে তিনি ব্রাজিলের কিংবদন্তি ফুটবলার পেলে ও রিভালদোর সঙ্গে যৌথভাবে সর্বাধিক বিশ্বকাপ ম্যাচে ১০ নম্বর জার্সি পরা খেলোয়াড়ের তালিকায় জায়গা করে নেন। ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ইতিহাস বিবেচনায় এটি একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ অর্জন।
১০ নম্বর জার্সি ব্রাজিলের ফুটবল সংস্কৃতিতে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। এই জার্সির সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত, বিশ্বকাপ জয় এবং কিংবদন্তি পারফরম্যান্স। পেলে এই জার্সিকে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ প্রতীকে পরিণত করেছিলেন। পরে জিকো, রিভালদো, রোনালদিনহো, কাকা এবং নেইমারের মতো তারকারা সেই ঐতিহ্য বহন করেছেন।
পেলে তাঁর চারটি বিশ্বকাপ অংশগ্রহণের সময় মোট ১৪ ম্যাচে ১০ নম্বর জার্সি পরে মাঠে নেমেছিলেন। অন্যদিকে রিভালদো দুটি বিশ্বকাপ আসরে খেলেই একই সংখ্যক ম্যাচে এই জার্সি গায়ে চাপিয়েছিলেন। এখন সেই তালিকায় যুক্ত হলো নেইমারের নামও। চারটি বিশ্বকাপ মিলিয়ে তিনিও ১৪ ম্যাচে ব্রাজিলের ১০ নম্বর জার্সি পরে মাঠে নামলেন।
নেইমারের বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালে নিজ দেশে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে। সেই আসরে তিনি পাঁচটি ম্যাচ খেলেছিলেন এবং ব্রাজিলের অন্যতম প্রধান তারকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। এরপর ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপেও খেলেন পাঁচ ম্যাচ। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ইনজুরির কারণে কিছুটা সীমিত সময় মাঠে থাকলেও তিনটি ম্যাচে অংশ নেন। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামার মাধ্যমে তাঁর বিশ্বকাপ ম্যাচ সংখ্যা ১৪-তে পৌঁছে যায়।
এই অর্জনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর জাতীয় দলের হয়ে আর মাঠে নামতে পারেননি নেইমার। গুরুতর ইনজুরি তাঁর ক্যারিয়ারকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছিল। দীর্ঘ পুনর্বাসন, চিকিৎসা এবং ফিটনেস পুনরুদ্ধারের কঠিন পথ পাড়ি দিতে হয়েছে তাঁকে। অনেকেই ধারণা করেছিলেন, হয়তো আর আগের ছন্দে ফিরতে পারবেন না ব্রাজিলিয়ান এই তারকা। কিন্তু সব বাধা অতিক্রম করে তিনি আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরে এসেছেন।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি তাঁর ওপর আস্থা রাখেন। যদিও প্রথম দুই ম্যাচে তাঁকে মাঠে নামানো হয়নি, তবুও স্কোয়াডে রাখা হয়েছিল। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে। তাঁর মাঠে নামার মুহূর্তে স্টেডিয়ামজুড়ে যে উচ্ছ্বাস দেখা গেছে, তা প্রমাণ করে ব্রাজিল সমর্থকদের কাছে নেইমারের গুরুত্ব কতটা।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ডের কাছেও পৌঁছে গেছেন ৩৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড। ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে ১০ নম্বর জার্সি পরে এখন পর্যন্ত ৯৮টি ম্যাচ খেলেছেন তিনি। এই তালিকায় তাঁর ওপরে রয়েছেন শুধুমাত্র ফুটবল সম্রাট পেলে। কিংবদন্তি এই ফুটবলার ব্রাজিলের হয়ে ১০ নম্বর জার্সি পরে ১০৫টি ম্যাচ খেলেছিলেন।
ফলে নকআউট পর্বে মাঠে নামলে নেইমার স্পর্শ করবেন শততম ম্যাচের মাইলফলক। আর মাত্র দুটি ম্যাচ খেললেই তিনি ব্রাজিলের ইতিহাসে ১০ নম্বর জার্সিতে ১০০ ম্যাচ খেলা দ্বিতীয় ফুটবলার হিসেবে নতুন ইতিহাস গড়বেন। এটি এমন একটি অর্জন, যা তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
বর্তমান ব্রাজিল দলে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রদ্রিগো এবং ম্যাথিউস কুনহার মতো তরুণ তারকারা দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছেন। তবে অভিজ্ঞতা এবং নেতৃত্বের জায়গায় নেইমারের বিকল্প খুঁজে পাওয়া কঠিন। বড় ম্যাচের চাপ সামলানো, সৃজনশীল আক্রমণ গড়ে তোলা এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে পার্থক্য গড়ে দেওয়ার ক্ষমতা তাঁকে এখনও দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে রাখছে।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব সামনে রেখে ব্রাজিল শিবিরে নেইমারের প্রত্যাবর্তন নিঃসন্দেহে বড় স্বস্তির খবর। একই সঙ্গে পেলে ও রিভালদোর মতো কিংবদন্তিদের পাশে নিজের নাম লেখানো তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় অর্জন হয়ে থাকবে।
ফুটবলের ইতিহাসে রেকর্ড আসে, আবার ভেঙেও যায়। কিন্তু ব্রাজিলের ১০ নম্বর জার্সির সঙ্গে নাম জড়িয়ে যাওয়া সবসময়ই বিশেষ কিছু। আর সেই বিশেষ তালিকায় পেলে ও রিভালদোর পাশে দাঁড়িয়ে নেইমার আবারও প্রমাণ করলেন, তিনি শুধু একজন তারকা নন; তিনি ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ইতিহাসেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত