ভিনির গোলে জাগছে ব্রাজিলের ষষ্ঠ শিরোপার স্বপ্ন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬
  • ২২ বার

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব শেষ হতে না হতেই ফুটবল বিশ্বে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন ব্রাজিলের তারকা ফরোয়ার্ড ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। দুর্দান্ত ফর্মে থাকা এই ব্রাজিলিয়ান তারকা টানা তিন ম্যাচে গোল করে শুধু নিজের সামর্থ্যেরই প্রমাণ দেননি, বরং জাগিয়ে তুলেছেন ব্রাজিল সমর্থকদের বহুদিনের স্বপ্নও। বিশ্বকাপ ইতিহাসের একটি বিরল পরিসংখ্যান এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে, আর সেই পরিসংখ্যানই বলছে—যখনই কোনো ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড় বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচেই গোল করেছেন, তখনই শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জিতেছে ব্রাজিল।

বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি ব্রাজিল সর্বশেষ বিশ্বকাপ জিতেছিল ২০০২ সালে। এরপর পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলটি বারবার শিরোপার খুব কাছে গিয়েও হতাশ হয়েছে। তবে এবার যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় অনুষ্ঠিত ২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে ঘিরে প্রত্যাশার মাত্রা ভিন্ন। এর বড় কারণ নতুন কোচ কার্লো আনচেলত্তির অধীনে দলের পরিবর্তিত রূপ এবং ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের অসাধারণ পারফরম্যান্স।

গ্রুপ পর্বে ব্রাজিলের তিনটি ম্যাচেই গোল করেছেন ভিনিসিয়ুস। সর্বশেষ স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের প্রথমার্ধেই জোড়া গোল করে নিজের ফর্মের জানান দেন তিনি। মাঠে তাঁর গতি, ড্রিবলিং, ফিনিশিং এবং আত্মবিশ্বাস প্রতিপক্ষ রক্ষণভাগকে বারবার বিপাকে ফেলেছে। বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত পারফর্মারদের একজন হিসেবে ইতোমধ্যেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এই তারকা।

তবে ভিনিসিয়ুসের গোলের ধারাবাহিকতাকে ঘিরে আলোচনার মূল কারণ শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়। বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ ইতিহাসের এক আকর্ষণীয় অধ্যায়। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ব্রাজিলের কোনো খেলোয়াড় যখন গ্রুপ পর্বের প্রতিটি ম্যাচে গোল করেছেন, তখন সেই আসরে সেলেসাওরা শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ শিরোপা নিজেদের করে নিয়েছে।

১৯৭০ সালের বিশ্বকাপকে অনেকেই ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা বিশ্বকাপ হিসেবে বিবেচনা করেন। সেই আসরে কিংবদন্তি জাইরজিনিও গ্রুপ পর্বের প্রতিটি ম্যাচে গোল করেছিলেন। শুধু তাই নয়, পুরো টুর্নামেন্টেই দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়ে ব্রাজিলকে শিরোপা জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। মেক্সিকোয় অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপে পেলের নেতৃত্বে ব্রাজিল তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে স্থায়ীভাবে জুলে রিমে ট্রফি নিজেদের করে নেয়।

এরপর ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে একই ধরনের ঘটনা দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপে রোমারিও ছিলেন ব্রাজিলের প্রধান ভরসা। গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচেই গোল করেছিলেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বে ব্রাজিল দীর্ঘ ২৪ বছরের অপেক্ষা শেষে চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা জিতে নেয়। রোমারিওর পারফরম্যান্স সেই আসরের অন্যতম সেরা ব্যক্তিগত প্রদর্শনী হিসেবে এখনও স্মরণ করা হয়।

২০০২ সালের বিশ্বকাপে ইতিহাস আরও বিস্ময়করভাবে পুনরাবৃত্তি হয়। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে অনুষ্ঠিত সেই আসরে ব্রাজিলের দুই তারকা রোনালদো ও রিভালদো দুজনই গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচে গোল করেন। পরবর্তীতে রোনালদোর দুর্দান্ত নৈপুণ্যে ব্রাজিল পঞ্চমবারের মতো বিশ্বকাপ জিতে ইতিহাস গড়ে। সেটিই ছিল ব্রাজিলের সর্বশেষ বিশ্বকাপ জয়।

এবার ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই তালিকায় যুক্ত হলো ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের নাম। ফলে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে নতুন করে শুরু হয়েছে আলোচনা। অনেকেই বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন যে ইতিহাস হয়তো আবারও নিজেদের পুনরাবৃত্তি করতে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। ব্রাজিল সমর্থকদের মধ্যে আশাবাদ আরও বেড়েছে, কারণ অতীতের প্রতিটি উদাহরণই তাদের পক্ষে কথা বলছে।

তবে ফুটবল বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিচ্ছেন, ইতিহাস কখনোই ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা নয়। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে প্রতিটি ম্যাচের চ্যালেঞ্জ ভিন্ন। একটি ভুল, একটি মুহূর্ত কিংবা একটি সিদ্ধান্ত পুরো টুর্নামেন্টের গতিপথ বদলে দিতে পারে। তাই শুধুমাত্র পরিসংখ্যানের ওপর নির্ভর করে ব্রাজিলকে চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করার সুযোগ নেই।

তারপরও বাস্তবতা হলো, বর্তমান ব্রাজিল দলটি আগের কয়েকটি আসরের তুলনায় অনেক বেশি ভারসাম্যপূর্ণ। আক্রমণভাগে ভিনিসিয়ুসের পাশাপাশি রয়েছে তরুণ ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের সমন্বয়। মাঝমাঠে সৃজনশীলতা এবং রক্ষণভাগে স্থিতিশীলতা দলটিকে আরও শক্তিশালী করেছে। এর সঙ্গে কার্লো আনচেলত্তির মতো অভিজ্ঞ কোচের উপস্থিতি ব্রাজিলকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের বর্তমান ফর্ম ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় শক্তি। ক্লাব ফুটবলে গত কয়েক মৌসুম ধরে তিনি নিজেকে বিশ্বের অন্যতম সেরা আক্রমণভাগের খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সেই ধারাবাহিকতাই এখন জাতীয় দলের জার্সিতেও দেখা যাচ্ছে। বড় ম্যাচে দায়িত্ব নেওয়ার মানসিকতা এবং গোল করার ক্ষুধা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

বিশ্বকাপ যত এগোচ্ছে, ততই বাড়ছে চাপ ও প্রত্যাশা। ব্রাজিল সমর্থকরা এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন নকআউট পর্বের জন্য। তারা বিশ্বাস করতে চান যে জাইরজিনিও, রোমারিও, রোনালদো ও রিভালদোর মতোই ভিনিসিয়ুস জুনিয়রও ইতিহাসের ধারাবাহিকতা ধরে রাখবেন। তবে শেষ পর্যন্ত ইতিহাস নয়, মাঠের পারফরম্যান্সই নির্ধারণ করবে বিশ্বকাপের ভাগ্য।

তবুও একটি বিষয় নিশ্চিত—ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের টানা তিন ম্যাচে গোল করা ইতোমধ্যেই ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত গল্পে পরিণত হয়েছে। আর সেই গল্পের শেষ অধ্যায়ে যদি ব্রাজিলের হাতে ওঠে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ ট্রফি, তাহলে বর্তমানের এই পরিসংখ্যান ভবিষ্যতে আরও একটি কিংবদন্তির অংশ হয়ে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত