প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বকাপের মঞ্চে অঘটনের গল্প নতুন নয়। তবে কিছু কিছু জয় শুধু একটি ম্যাচের ফলাফল বদলে দেয় না, বদলে দেয় একটি দেশের ফুটবল ইতিহাসও। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার জয় তেমনই এক স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকল। এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী দল দক্ষিণ কোরিয়াকে ১-০ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জায়গা করে নিয়েছে আফ্রিকার প্রতিনিধিরা।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) মেক্সিকোর এস্তাদিও মন্তেরেতে অনুষ্ঠিত গ্রুপ ‘এ’-এর গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকা নিজেদের সেরাটা উজাড় করে দেয়। ম্যাচজুড়ে শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ, দ্রুতগতির আক্রমণ এবং অসাধারণ দলগত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে তারা দক্ষিণ কোরিয়াকে চাপে রাখে। শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয়ার্ধে থাপেলো মাসেকোর একমাত্র গোলে জয় নিশ্চিত করে বাফানা বাফানা নামে পরিচিত দলটি।
এই জয়ের মধ্য দিয়ে শুধু তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টই অর্জন করেনি দক্ষিণ আফ্রিকা, বরং লিখেছে নিজেদের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়গুলোর একটি। ১৬ বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরে এসে সরাসরি নকআউট পর্বে পৌঁছানো নিঃসন্দেহে তাদের জন্য এক বিশাল অর্জন। এর আগে একাধিকবার বিশ্বকাপে অংশ নিলেও কখনোই গ্রুপ পর্বের বাধা অতিক্রম করতে পারেনি দলটি।
ম্যাচের আগে কাগজে-কলমে পরিষ্কার ফেবারিট ছিল দক্ষিণ কোরিয়া। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স, শক্তিশালী স্কোয়াড এবং আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অভিজ্ঞতার কারণে এশিয়ার দলটিকে এগিয়ে রেখেছিলেন অধিকাংশ বিশ্লেষক। কিন্তু মাঠের লড়াইয়ে সেই হিসাব পুরোপুরি পাল্টে দেয় দক্ষিণ আফ্রিকা।
প্রথমার্ধে দুই দলই কয়েকটি সুযোগ তৈরি করলেও গোলের দেখা পায়নি। দক্ষিণ কোরিয়া বল দখলে এগিয়ে থাকলেও দক্ষিণ আফ্রিকার রক্ষণভাগ ছিল অত্যন্ত সংগঠিত। প্রতিটি আক্রমণ ধৈর্য ও শৃঙ্খলার সঙ্গে প্রতিহত করে তারা। একই সঙ্গে পাল্টা আক্রমণে দক্ষিণ কোরিয়ার ডিফেন্সকে বারবার সতর্ক থাকতে বাধ্য করে আফ্রিকান দলটি।
ম্যাচের মোড় ঘুরে যায় দ্বিতীয়ার্ধে। দ্রুতগতির এক আক্রমণ থেকে সুযোগ তৈরি করেন দক্ষিণ আফ্রিকার ফরোয়ার্ডরা। সেই আক্রমণের শেষ মুহূর্তে বল পেয়ে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে জালে পাঠান থাপেলো মাসেকো। তাঁর সেই গোলই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। গোল হজমের পর দক্ষিণ কোরিয়া আক্রমণের গতি বাড়ালেও দক্ষিণ আফ্রিকার রক্ষণপ্রাচীর ভাঙতে পারেনি।
শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে উল্লাসে ফেটে পড়ে দক্ষিণ আফ্রিকার খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ এবং সমর্থকরা। কারণ তারা জানত, এটি শুধুমাত্র একটি জয় নয়; এটি বহু বছরের অপেক্ষার অবসান। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বে জায়গা নিশ্চিত করার আনন্দ ছিল তাদের চোখেমুখে স্পষ্ট।
গ্রুপ পর্বে দক্ষিণ আফ্রিকার যাত্রা সহজ ছিল না। টুর্নামেন্টের শুরুতে মেক্সিকোর কাছে পরাজয় দিয়ে অভিযান শুরু করেছিল তারা। সেই হারের পর অনেকেই দলটিকে নকআউট পর্বের হিসাব থেকে প্রায় বাদ দিয়েছিলেন। কিন্তু ফুটবলের সৌন্দর্যই হলো, একটি দল যদি আত্মবিশ্বাস ধরে রাখতে পারে, তাহলে পরিস্থিতি বদলাতে বেশি সময় লাগে না। দক্ষিণ আফ্রিকা ঠিক সেটিই করেছে।
মেক্সিকোর বিপক্ষে হার থেকে শিক্ষা নিয়ে পরবর্তী ম্যাচগুলোতে নিজেদের কৌশলগত দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠে দলটি। খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাসও ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে সেই উন্নতির প্রতিফলন স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। পুরো দল একসঙ্গে লড়াই করেছে এবং সুযোগ কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে দেখিয়েছে পরিপক্বতা।
এই জয়ের ফলে দক্ষিণ আফ্রিকা তিন ম্যাচ শেষে চার পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ ‘এ’-এর রানার্সআপ হিসেবে নকআউট পর্বে জায়গা নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে, টানা তিন ম্যাচ জিতে পূর্ণ নয় পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে মেক্সিকো। স্বাগতিকদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের কারণে গ্রুপের শীর্ষস্থান নিয়ে খুব বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি।
দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য এই পরাজয় অবশ্য বড় হতাশার। বিশ্বকাপের আগে দলটিকে গ্রুপ থেকে সহজেই উত্তীর্ণ হওয়ার অন্যতম দাবিদার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে কাঙ্ক্ষিত পারফরম্যান্স দেখাতে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের ভাগ্য এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে। নকআউট পর্বে ওঠার সম্ভাবনা নির্ভর করবে অন্যান্য গ্রুপের ফলাফলের ওপর এবং সেরা তৃতীয় স্থানধারী দলগুলোর হিসাব-নিকাশের ওপর।
বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ আফ্রিকার এই সাফল্য আফ্রিকান ফুটবলের জন্যও ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করার চেষ্টা করছে। মরক্কোর ঐতিহাসিক সাফল্যের পর দক্ষিণ আফ্রিকার এই অর্জনও মহাদেশটির ফুটবল উন্নয়নের ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এখন দক্ষিণ আফ্রিকার সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। নকআউট পর্বে প্রতিপক্ষ হবে আরও শক্তিশালী। তবে বর্তমান ফর্ম এবং আত্মবিশ্বাস বিবেচনায় বাফানা বাফানাকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। বিশ্বকাপে তারা ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছে যে, সাহস, শৃঙ্খলা এবং দলগত প্রচেষ্টা থাকলে যেকোনো অঘটন সম্ভব।
বিশ্বকাপের এই মঞ্চে দক্ষিণ আফ্রিকার গল্প এখন আর শুধু অংশগ্রহণের নয়, বরং ইতিহাস গড়ার। আর সেই ইতিহাসের নতুন অধ্যায় শুরু হলো দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে এক স্মরণীয় জয়ের মধ্য দিয়ে।