নবম পে স্কেলে অগ্রগতি, সচিব কমিটির পাঁচ সিদ্ধান্ত

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬
  • ১০ বার

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। জনপ্রশাসন-সংক্রান্ত পে কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনার পর নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সচিব কমিটি। সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং বেতন কাঠামোর বৈষম্য কমানোর বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন বেতন কাঠামোর রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

বুধবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে পে কমিশনের বিভিন্ন সুপারিশ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে জনপ্রশাসন খাতের বেশিরভাগ সুপারিশ নিয়ে নীতিগত ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হলেও বিচার বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনী সম্পর্কিত কিছু প্রস্তাব এখনও চূড়ান্ত হয়নি। এসব বিষয়ে আরও পর্যালোচনা শেষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে বলে জানা গেছে।

বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি সরকারি চাকরিজীবীদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে বেতন বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে আসছিলেন। সচিব কমিটির আলোচনায় এই বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। সূত্র জানায়, নতুন পে স্কেলের মাধ্যমে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মচারীদের আর্থিক স্বস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের বেতন বৈষম্য কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বৈঠকে গৃহীত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নকে ধাপে ধাপে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা। প্রাথমিকভাবে তিন ধাপে বাস্তবায়নের চিন্তা থাকলেও পরবর্তীতে তা কমিয়ে দুই ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে কর্মচারীরা তুলনামূলক দ্রুত বর্ধিত বেতনের সুবিধা পাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য প্রথম ধাপেই বর্ধিত সুবিধার বড় অংশ কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। একইভাবে ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের জন্যও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে। যদিও চূড়ান্ত হার এখনও প্রকাশ করা হয়নি, তবুও সংশ্লিষ্ট মহলে নতুন পে স্কেল নিয়ে আশাবাদ তৈরি হয়েছে।

আলোচনায় আরও গুরুত্ব পেয়েছে ১১তম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের বেতন কাঠামোগত বৈষম্য দূর করার বিষয়টি। বিভিন্ন গ্রেডের মধ্যে ব্যবধান ও পদোন্নতির পর আর্থিক সুবিধার পার্থক্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ ছিল। নতুন কাঠামোতে এ বিষয়গুলো সমন্বয়ের জন্য একটি পৃথক রোডম্যাপ তৈরির কাজ চলছে বলে জানা গেছে।

শুধু মূল বেতন নয়, ভাতার ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। সরকারি চাকরিজীবীদের বাড়িভাড়া ভাতা এবং চিকিৎসা ভাতা বর্তমান বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার বিষয়ে বৈঠকে জোরালো আলোচনা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সময়ে শুধু মূল বেতন বৃদ্ধি নয়, বরং আনুষঙ্গিক সুবিধা বাড়ানোও কর্মচারীদের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অবসরোত্তর ছুটিতে (এলপিআর) থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন পে স্কেলের আওতায় আনার সম্ভাবনা। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এ বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান রয়েছে এবং চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে তারাও নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। এতে অবসরের প্রাক্কালে থাকা বিপুলসংখ্যক সরকারি কর্মচারী উপকৃত হবেন।

সরকারের লক্ষ্য আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন পে স্কেল কার্যকর করা। যদিও প্রশাসনিক প্রস্তুতি, সফটওয়্যার হালনাগাদ, বিধিমালা সংশোধন এবং আইনি প্রক্রিয়ার কারণে বাস্তবে বর্ধিত বেতন হাতে পেতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। তবে কার্যকারিতা শুরুর তারিখ থেকে প্রাপ্য অর্থ পরবর্তীতে অ্যারিয়ার হিসেবে পরিশোধের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে।

এদিকে পে স্কেল ঘোষণার আগে সম্ভাব্য আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা এড়াতে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিধিমালা সংশোধন, আইনি ভেটিং এবং বাস্তবায়ন কাঠামো চূড়ান্ত করার কাজ এগিয়ে নিচ্ছেন।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিচার বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনীর বেতন কাঠামো সম্পর্কিত সুপারিশ নিয়ে আরও আলোচনা প্রয়োজন। এ কারণে সচিব কমিটির আরও একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে। সেখানে এসব খাতের চূড়ান্ত প্রস্তাব অনুমোদনের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি আলোচনাকে ফলপ্রসূ বলে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, সরকারি চাকরিজীবীদের স্বার্থ, রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা বিবেচনায় রেখেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হচ্ছে। এখন প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারির অপেক্ষা।

সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের পথে নবম পে স্কেল একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন সম্ভব হয়, তাহলে এটি দেশের লাখো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর আর্থিক স্বস্তি ও জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত