প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ শিল্প অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে নতুন করে বিমান হামলার ঘটনা ঘটেছে। ইরানের দুটি বড় স্টিল কারখানায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ বিমান হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা। হামলার ফলে শিল্প উৎপাদন, অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইরানি বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার (২৭ মার্চ) বিকেলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুজেস্তান প্রদেশে অবস্থিত Khuzestan Steel Company এবং ইসফাহান অঞ্চলের বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান Mobarakeh Steel Company-এ বিমান হামলা চালানো হয়। হামলার ফলে স্থাপনাগুলোর বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। এই দুটি প্রতিষ্ঠান ইরানের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয় এবং দেশটির ইস্পাত উৎপাদনের বড় অংশ এখান থেকেই সরবরাহ করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ইরানের সামরিক বাহিনীর প্রভাবশালী শাখা Islamic Revolutionary Guard Corps-এর সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে পশ্চিমা দেশগুলো। ফলে কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনায় এসব স্থাপনা হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্যে জানা গেছে, ইরানের ওপর সাম্প্রতিক হামলার পরিধি ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে। প্রথমদিকে পারমাণবিক স্থাপনা ও সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালানো হলেও এখন শিল্প অবকাঠামোতেও আঘাত হানা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে প্রতিপক্ষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা দুর্বল করার কৌশল নেওয়া হয়েছে।
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী Benjamin Netanyahu এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী Israel Katz ইরানের স্টিল কারখানায় হামলার অনুমোদন দিয়েছেন। এর আগে তারা জানিয়েছিলেন, প্রয়োজনে হামলার তীব্রতা আরও বাড়ানো হবে এবং কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত অব্যাহত থাকবে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, শিল্প অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হলে তার প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় পড়তে পারে। কারণ বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয়ের অন্যতম উৎস। ফলে এসব স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতি হলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চলমান সংঘাতের সময় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর পাশাপাশি শিল্প খাতেও হামলা চালানোর প্রবণতা বেড়েছে। এর আগে গত বছরের জুনে ১২ দিনের সংঘর্ষেও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছিল। বর্তমান সংঘাত প্রায় এক মাস ধরে চলমান রয়েছে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হামলার ধরনে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
ইরানের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, এই হামলার জন্য ইসরাইল দায়ী। যদিও ইসরাইলি সামরিক বাহিনী দুটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার কথা স্বীকার করেছে, অন্যান্য শিল্প স্থাপনায় হামলার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি। তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, কৌশলগত কারণে অনেক তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, শিল্প খাতে হামলা বৃদ্ধি পাওয়ার অর্থ হচ্ছে সংঘাত এখন সামরিক সীমা ছাড়িয়ে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলছে। ইস্পাত শিল্প ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন খাত হওয়ায় এই হামলা দেশটির অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ইতোমধ্যে জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বিনিয়োগ পরিবেশেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ইসরাইল এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছে, তারা প্রয়োজন হলে অবকাঠামোর ওপর হামলা আরও জোরদার করবে। এতে সংঘাতের বিস্তার আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অন্যদিকে ইরানও পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করছে। তবে এখন পর্যন্ত সংঘাত থামার সুস্পষ্ট কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, শিল্প অবকাঠামোতে হামলা সংঘাতের নতুন মাত্রা নির্দেশ করে। এর ফলে শুধু সামরিক নয়, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতাও তীব্র হতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কৌশলগত সিদ্ধান্তের ওপর।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে। কারণ দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের প্রভাব সরাসরি অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং জীবনযাত্রায় পড়ে। তাই দ্রুত শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানাচ্ছে আন্তর্জাতিক মহল।