প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পূর্ব ইউরোপে চলমান সংঘাতের মধ্যে আবারও সহিংসতার নতুন অধ্যায় যোগ হয়েছে। Ukraine-এর বিভিন্ন অঞ্চলে Russia-র বোমা হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত এবং কমপক্ষে ১৪ জন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশ কয়েকটি বহুতল ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং চিকিৎসাসেবা সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইউক্রেনও রাশিয়ার ভেতরে ড্রোন হামলা জোরদার করেছে বলে জানা গেছে, যা চলমান যুদ্ধকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
স্থানীয় সময় রোববার ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় Kramatorsk শহরে গ্লাইড বোমা হামলা চালায় রুশ বাহিনী। Donetsk Oblast-এর গুরুত্বপূর্ণ এই শহরটি দীর্ঘদিন ধরেই সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, হামলার সময় প্রচণ্ড বিস্ফোরণে আশপাশের এলাকা কেঁপে ওঠে এবং বহু ভবনের জানালা ও দেয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থানীয় উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান। কয়েকটি আবাসিক ভবনের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বহু পরিবার সাময়িকভাবে আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে।
ইউক্রেনের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, বেসামরিক এলাকাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে হামলা চালানো হচ্ছে। তাদের দাবি, সামরিক স্থাপনা নয়, বরং সাধারণ মানুষের বসবাসের জায়গা এবং গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে আঘাত হানা হচ্ছে। রাজধানী Kyiv-এর আঞ্চলিক প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যুদ্ধের মধ্যে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী Odesa-তেও হামলার খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, একটি মাতৃসদন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশপাশে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে, যাতে কয়েকজন আহত হন। স্বাস্থ্যকর্মীরা আহতদের চিকিৎসা দিচ্ছেন এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা হচ্ছে। যুদ্ধের কারণে আগে থেকেই চাপের মধ্যে থাকা চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইউক্রেন রাশিয়ার অভ্যন্তরে কৌশলগত স্থাপনায় হামলা জোরদার করেছে বলে জানা গেছে। বাল্টিক সাগরের তীরবর্তী Ust-Luga বন্দরে ড্রোন হামলার ফলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। ইউক্রেনের নিরাপত্তা সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই ধরনের হামলার উদ্দেশ্য রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ ও রপ্তানি সক্ষমতা দুর্বল করা। যুদ্ধের শুরু থেকেই জ্বালানি অবকাঠামো উভয় পক্ষের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
রাশিয়ার পক্ষ থেকেও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ইউক্রেনীয় হামলার অভিযোগ করা হয়েছে। বিশেষ করে Belgorod Oblast এলাকায় ড্রোন হামলায় একজন নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে মস্কো। রুশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হয়েছে।
ইউক্রেনের সামরিক কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, রাশিয়া পাল্টা হামলার অংশ হিসেবে ৪৪২টি ড্রোন এবং একটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে, যার মধ্যে ৩৮০টি ভূপাতিত বা প্রতিহত করা হয়েছে। যদিও এই দাবিগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবুও উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলা সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ এখন ধীরে ধীরে অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা ধ্বংসের প্রতিযোগিতায় রূপ নিচ্ছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র, জ্বালানি স্থাপনা, বন্দর এবং পরিবহন ব্যবস্থার ওপর হামলা উভয় দেশের অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, দীর্ঘ সময় ধরে এমন হামলা চলতে থাকলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
২০২২ সালে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইউক্রেনের বিভিন্ন শহর বারবার হামলার শিকার হয়েছে। লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং বহু পরিবার তাদের স্বাভাবিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। যুদ্ধের কারণে খাদ্য, জ্বালানি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বারবার শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানালেও এখন পর্যন্ত সংঘাত বন্ধ হওয়ার কোনো ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে না।
মানবিক দিক থেকেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। হামলায় নিহত ও আহতদের পরিবারগুলোর জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে। অনেকেই তাদের বাসস্থান হারিয়েছেন, আবার কেউ হারিয়েছেন স্বজনদের। যুদ্ধক্ষেত্রের কাছাকাছি বসবাসকারী সাধারণ মানুষ প্রতিদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে অন্য এলাকায় চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক হামলা প্রমাণ করে যে উভয় পক্ষই কৌশলগত অবস্থান শক্ত করতে অব্যাহতভাবে সামরিক পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর ফলে সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে যুদ্ধের বিস্তার আশপাশের অঞ্চলগুলোর নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। জ্বালানি বাজার, খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর এর প্রভাব ইতোমধ্যে দৃশ্যমান।
সব মিলিয়ে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চলমান সংঘাত নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা এবং পাল্টাপাল্টি আঘাত পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে। যুদ্ধের সমাধান কবে হবে, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা থাকলেও মানবিক ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর উদ্যোগ জরুরি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।