যুদ্ধের উত্তেজনায় তেলের দাম ১১৫ ডলার ছাড়াল

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩০ মার্চ, ২০২৬
  • ১৬ বার
যুদ্ধের উত্তেজনায় তেলের দাম ১১৫ ডলার ছাড়াল

প্রকাশ: ৩০ মার্চ  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তে থাকা সামরিক উত্তেজনার প্রভাব সরাসরি পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। Iran-কে ঘিরে United States ও Israel-এর সঙ্গে সংঘাত তীব্র হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সোমবার এশিয়ার বাজারে লেনদেন শুরুর পর ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ৩ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৫ ডলার ছাড়িয়ে যায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে লেনদেন হওয়া ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI) তেলের দাম প্রায় ৩.৫ শতাংশ বেড়ে ১০৩ ডলারে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।

বৈশ্বিক বাজারে তেলের দামের এই ঊর্ধ্বগতি সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় মাসিক বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে ব্রেন্ট ক্রুড ইতিহাসের অন্যতম বড় মাসিক লাভের পথে রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। জ্বালানি বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে, যা দামকে আরও উঁচুতে নিয়ে যেতে পারে।

তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি এশিয়ার শেয়ারবাজারগুলোতেও বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। জাপানের প্রধান শেয়ার সূচক Nikkei 225 প্রায় ৪.৫ শতাংশ কমে যায়। একই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার KOSPI সূচক প্রায় ৪ শতাংশ পতন হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে বিনিয়োগ সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ Strait of Hormuz নিয়ে উদ্বেগ। ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যুদ্ধ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এই জলপথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হামলা হতে পারে। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই সংকীর্ণ প্রণালির মাধ্যমে পরিবহন করা হয়। ফলে এই পথ বাধাগ্রস্ত হলে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে বড় ধাক্কা লাগতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু হরমুজ প্রণালি নয়, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ Bab-el-Mandeb Strait নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই পথ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত Houthis গোষ্ঠী এই জলপথে জ্বালানি বহনকারী জাহাজে হামলা চালাতে পারে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা আরও বড় চাপের মুখে পড়তে পারে।

জ্বালানি বাজার বিশ্লেষক Sean Foley মনে করেন, সংঘাত দ্রুত কমানো না গেলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। তার মতে, মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামো হুমকির মুখে পড়লে বাজারে আতঙ্ক তৈরি হয়, যার ফলে দাম দ্রুত বাড়তে থাকে। সরবরাহ ঝুঁকি বাড়লে বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যৎ সংকটের আশঙ্কায় আগাম কেনাকাটা বাড়িয়ে দেন, যা দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২৭ ফেব্রুয়ারি ব্রেন্ট তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭২ ডলার। পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় ১৮ মার্চ তা বেড়ে ১১৯.৫০ ডলারে পৌঁছায়, যা ২০২২ সালের জুনের পর সর্বোচ্চ পর্যায়। এই দ্রুত উত্থান বিশ্ব অর্থনীতির জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট Donald Trump সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে ইরানের তেল সম্পদ নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে এবং দেশটির গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি কেন্দ্র Kharg Island দখল করার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। তার এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।

মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতিও বাড়ানো হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রের মতে, অতিরিক্ত প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা এই অঞ্চলে পৌঁছেছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলার আশঙ্কা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, প্রয়োজনে কঠোর জবাব দেওয়া হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায়, যা পণ্যদ্রব্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। ফলে অনেক দেশে মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা থাকে। উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, কারণ তাদের জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা বেশি।

এছাড়া শেয়ারবাজারের পতন বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অনিশ্চয়তা বাড়লে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে জ্বালানি, পরিবহন ও শিল্প খাত এই পরিস্থিতিতে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে।

মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বাড়লে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর চাপ বাড়বে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কূটনৈতিক সমাধান না হলে বৈশ্বিক অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপরও বড় প্রভাব ফেলছে। তেলের দাম ১১৫ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার ঘটনা সেই প্রভাবেরই প্রতিফলন। পরিস্থিতি কোন দিকে এগোয়, তা এখন নির্ভর করছে কূটনৈতিক পদক্ষেপ ও সামরিক উত্তেজনা কত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা যায় তার ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত