৬৪ জেলায় ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ, তরুণদের নতুন দিগন্ত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১৬ বার
ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ ৬৪ জেলায় বাংলাদেশ

প্রকাশঃ ০১ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশজুড়ে তরুণদের কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে সরকারিভাবে বড় উদ্যোগ হিসেবে ৬৪ জেলায় ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে। ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক কর্মবাজারে তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে নেওয়া এই প্রকল্পকে ঘিরে ইতোমধ্যেই ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। তিন মাস মেয়াদি এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে হাজার হাজার শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতী নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে আয় করার সুযোগ পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

বুধবার (১ এপ্রিল) যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ভার্চুয়ালি এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যুক্ত হয়ে উদ্বোধন ঘোষণা করেন মো. আমিনুল হক। সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন যুব উন্নয়ন অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. গাজী মো. সাইফুজ্জামান।

অনুষ্ঠানে ভার্চুয়াল মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কর্মকর্তারা যুক্ত হন এবং প্রায় পাঁচ হাজার প্রশিক্ষণার্থী অনলাইনে অংশগ্রহণ করেন। একইসঙ্গে প্রশিক্ষণ বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেডের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।

প্রতিমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, বর্তমান বিশ্বের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে হলে দক্ষতা অর্জনের বিকল্প নেই। তিনি উল্লেখ করেন, তরুণদের জন্য নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি করতে সরকার ফ্রিল্যান্সিং খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের যুবসমাজকে বৈশ্বিক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটের সঙ্গে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সভাপতির বক্তব্যে সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। তিনি জানান, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে তরুণদের স্বনির্ভর করে তোলাই এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। এতে করে শুধু ব্যক্তিগত আয় বৃদ্ধি নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। প্রায় ৩৭৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকার এই উদ্যোগের আওতায় মোট ৩৬ হাজার যুবক-যুবতীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং ধাপে ধাপে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

বর্তমানে ষষ্ঠ ব্যাচের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যেখানে দেশের প্রতিটি জেলা থেকে ৭৫ জন করে মোট ৪ হাজার ৮০০ প্রশিক্ষণার্থী অংশ নিচ্ছেন। ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী এবং ন্যূনতম এইচএসসি পাস শিক্ষিত তরুণদের মধ্য থেকে কঠোর বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের নির্বাচন করা হয়েছে। আবেদনকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় এক লাখের কাছাকাছি, যা এই কর্মসূচির প্রতি তরুণদের আগ্রহের একটি সুস্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে।

প্রশিক্ষণার্থীদের তিন মাসে মোট ৬০০ ঘণ্টা প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, যেখানে প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা করে ক্লাস নেওয়া হবে। এই প্রশিক্ষণে কম্পিউটার অফিস অ্যাপ্লিকেশন, ডিজিটাল মার্কেটিং, গ্রাফিক্স ডিজাইন, ভিডিও এডিটিং, ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের কৌশল, বেসিক ইংলিশ এবং সফট স্কিলসহ আধুনিক নানা বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া স্মার্টফোন ব্যবহার করে ফ্রিল্যান্সিংয়ের মতো নতুন ধারণাও প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে।

প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারীদের সনদপত্র দেওয়া হবে এবং তাদের কর্মসংস্থানে সহায়তা করতে প্রতিটি জেলায় মেন্টরিং ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এতে করে প্রশিক্ষণ শেষে তারা যাতে সরাসরি আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসে কাজ শুরু করতে পারেন, সে বিষয়টি নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

প্রকল্পের অগ্রগতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইতোমধ্যে পাঁচটি ব্যাচে মোট ১৪ হাজার ৪০০ জন প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন। এর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ প্রশিক্ষণার্থী দেশি ও আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসে কাজ করছেন। তাদের মোট আয় দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৪৫ হাজার ডলারের বেশি, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২২ কোটিরও বেশি টাকা। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, সঠিক প্রশিক্ষণ ও দিকনির্দেশনা পেলে দেশের তরুণরা বৈশ্বিক বাজারে সফল হতে পারে।

ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ আলম বলেন, প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরি করা হয়েছে, যেখানে তাদের কাজের অগ্রগতি ও আয়ের তথ্য সংরক্ষণ করা হয়। তিনি নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, ফ্রিল্যান্সিং শুধু আয়ের উৎস নয়, বরং এটি একটি স্বাধীন পেশা, যা তরুণদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সহায়তা করে।

এই প্রকল্পের মাধ্যমে শুধু শহর নয়, গ্রাম পর্যায়েও ডিজিটাল দক্ষতা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। ফলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের তরুণরাও ঘরে বসেই বৈশ্বিক বাজারে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন। এতে করে অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থানের চাপ কমার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন পথ তৈরি হচ্ছে।

সামগ্রিকভাবে এই উদ্যোগকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে টিকে থাকতে হলে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার বিকল্প নেই, আর সেই লক্ষ্যেই এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে। তরুণদের স্বপ্ন, দক্ষতা এবং কর্মসংস্থানের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরি করতে এই প্রকল্প ভবিষ্যতে আরও বড় ভূমিকা রাখবে বলেই সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত