প্রকাশ: ২১ জুলাই, ২০২৫ | নিজস্ব প্রতিবেদক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
রাজধানীতে চলমান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে দায়ের করা পৃথক দুটি হত্যাচেষ্টা মামলায় দেশের রাজনীতির বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সাবেক ব্যক্তি ও সরকারি কর্মকর্তাকে গ্রেফতার দেখানোর আদেশ দিয়েছে আদালত। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জি এম ফারহান ইশতিয়াকের আদালত সোমবার (২১ জুলাই) এই আদেশ দেন। গ্রেফতার দেখানো সাতজন ব্যক্তির মধ্যে রয়েছেন সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা রাশেদ খান মেনন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলাম, সাবেক সংসদ সদস্য সাদেক খান এবং ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তারা আদালতে তাদেরকে গ্রেফতার দেখানোর জন্য আবেদন করলে আদালত শুনানি শেষে তা মঞ্জুর করেন। গ্রেফতার দেখানোর পর তাদের বিরুদ্ধে তদন্তের পথ আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত হলো।
আনিসুল হক, সালমান এফ রহমান, ইনু, মেনন, আতিকুল ইসলাম ও সাদেক খানকে মোহাম্মদপুর থানার একটি হত্যা চেষ্টা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। মামলার সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ময়ূর ভিলা সড়কে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ চলাকালে বেলা ১১টার দিকে আন্দোলনে অংশ নেওয়া শাহরিয়ার হোসেন রোকন নামে একজন গুলিবিদ্ধ হন। অভিযোগ রয়েছে, অভিযুক্তদের নির্দেশেই সেদিন আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানো হয়, যা রোকনের পায়ে লাগে এবং তিনি মাটিতে পড়ে যান। এ ঘটনায় ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুর থানায় হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়।
অন্যদিকে ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা মুগদা থানাধীন এলাকায় সংঘটিত একটি পৃথক ঘটনায়। গত বছরের ১৮ জুলাই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় ঢাকা জজ কোর্টের আইনজীবী আব্দুল বাছেত শামীম আদালতের কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে বাবু ডাক্তারের গলিতে রাবার বুলেট হামলার শিকার হন। তার হাতে, কপালে, বুকে, চোয়ালে এবং পেটে একাধিক স্থানে আঘাত লাগে। শুরুতে প্রাথমিক চিকিৎসা গ্রহণ করলেও পরবর্তী সময়ে শারীরিক জটিলতা বাড়লে ২০ আগস্ট মুগদা জেনারেল হাসপাতালে পুনরায় চিকিৎসা নিতে হয়। ঘটনার প্রায় দেড় মাস পর, ১ সেপ্টেম্বর, তিনি মুগদা থানায় একটি হত্যা চেষ্টা মামলা করেন, যেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট ৫১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। ব্যারিস্টার সুমন এই মামলার ২৫ নম্বর এজাহারভুক্ত আসামি।
প্রসঙ্গত, চলমান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনা বেড়ে চলেছে। আন্দোলনকারী ছাত্রদের দাবি অনুযায়ী, সরকারি নিয়োগ, শিক্ষাঙ্গনের সুযোগ, উন্নয়ন প্রকল্প ও সামাজিক নিরাপত্তা বণ্টনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা অঞ্চলের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে, যা তারা পরিবর্তনের দাবিতে রাজপথে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।
এমন এক প্রেক্ষাপটে রাজনীতির প্রথম সারির প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেফতার দেখানো নিঃসন্দেহে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নাটকীয় মোড় তৈরি করেছে। বিশেষ করে এই মামলার তালিকায় এমন ব্যক্তিদের নাম রয়েছে, যাদের কেউ কেউ দীর্ঘদিন সংসদ সদস্য, মন্ত্রী কিংবা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। ফলে এই গ্রেফতার আদেশ শুধু আইনগত প্রক্রিয়াতেই নয়, বরং রাজনৈতিক পরিসরে, সামাজিক মাধ্যম ও জনমানসে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিচ্ছে।
আইনজীবী মহলের মতে, মামলাগুলোর তদন্ত এখন বিশেষভাবে নজরে থাকবে, কারণ এটি ভবিষ্যতের অনেক জটিল রাজনৈতিক ও আইনি পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে। মামলাগুলোর যথাযথ ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযুক্তদের আইনি অধিকার নিশ্চিত করা এখন বিচার ব্যবস্থার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।
এই গ্রেফতার আদেশ আদৌ স্থায়ী আইনি পদক্ষেপে রূপ নেয় কিনা কিংবা তা আসন্ন রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে—তা সময়ই বলে দেবে। তবে এই মুহূর্তে স্পষ্ট যে, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পরিণতি ক্রমেই আরও বিস্তৃত ও গভীর হয়ে উঠছে, এবং তার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ছে রাজনীতির সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত।