দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৮ বার
দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি

প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি গত দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশটির সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মার্চ মাসে ভোক্তা মূল্যসূচক (CPI) ৩ দশমিক ৩ শতাংশে উঠেছে, যা ফেব্রুয়ারির ২ দশমিক ৪ শতাংশের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই উল্লম্ফন মূলত জ্বালানির দামের দ্রুত বৃদ্ধির কারণে, যার পেছনে রয়েছে Iran–Israel conflict এবং বৈশ্বিক তেল সরবরাহে অস্থিরতা।

যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এটি ২০২২ সালের পর সবচেয়ে বড় মাসিক মূল্যস্ফীতির বৃদ্ধি। সে সময় Russia–Ukraine war শুরু হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতেও একই ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে দেখা যাচ্ছে জ্বালানি খাতকে। হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পেট্রোল পাম্পে, যেখানে সাধারণ ভোক্তাদের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।

একজন ২৩ বছর বয়সী ট্রাকচালক অ্যানেল ভিলেগাস জানান, তার দৈনন্দিন খরচ আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। আগে যেখানে ট্যাংক ভরতে ৫০ থেকে ৬০ ডলার লাগত, এখন সেখানে ৭০ থেকে ৮০ ডলার খরচ হচ্ছে। তিনি বলেন, জীবিকার প্রয়োজনে গাড়ি চালানো কমানো সম্ভব নয়, ফলে বাধ্য হয়েই বাড়তি ব্যয় মেনে নিতে হচ্ছে।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে গ্যাসোলিনের দাম বেড়েছে ২১ দশমিক ২ শতাংশ, যা ১৯৬৭ সাল থেকে রেকর্ড করা তথ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ মাসিক বৃদ্ধি। একই সময়ে ভারী তেলের দামও ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে, যা ২০০০ সালের পর সবচেয়ে বড় উল্লম্ফন।

এই মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে ক্যালিফোর্নিয়ার মতো অঙ্গরাজ্যে, যেখানে জ্বালানির দাম তুলনামূলকভাবে আগে থেকেই বেশি। সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যায়, সেখানে প্রতি গ্যালন গ্যাসের গড় দাম প্রায় ৫ দশমিক ৯৩ ডলার, যেখানে জাতীয় গড় ৪ দশমিক ১৬ ডলার।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির প্রায় তিন-চতুর্থাংশই এসেছে জ্বালানির দামের কারণে। পাশাপাশি বিমানভাড়া ও পোশাকের দামও বেড়েছে, যা উচ্চ পরিবহন ব্যয় ও শুল্কনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ধারণা করা হচ্ছে।

খাদ্যপণ্যের দাম আপাতত স্থিতিশীল থাকলেও বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন যে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সারের দাম বাড়ার কারণে ভবিষ্যতে খাদ্যপণ্যের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।

বাজার বিশ্লেষক আরিয়েল ইনগ্রাসিয়া বলেন, বর্তমানে যা দেখা যাচ্ছে তা মূলত জ্বালানিনির্ভর মূল্যস্ফীতির পুনরাগমন। তবে এটি এখনো পুরো অর্থনীতির ভেতরে গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। তার মতে, জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ থাকলে তার প্রভাব ধীরে ধীরে অন্যান্য খাতেও ছড়িয়ে পড়বে।

হরমুজ প্রণালি শুধু তেল পরিবহনের জন্যই নয়, বরং প্রাকৃতিক গ্যাস, সার, অ্যালুমিনিয়াম ও হিলিয়াম পরিবহনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। এই পথটি বিঘ্নিত হলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন আলোচনায় সরবরাহ পুনরায় স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তবে সম্পূর্ণ স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে সময় লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তেলের দাম সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা কমলেও তা এখনো যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি। এর ফলে শুধু জ্বালানি নয়, অন্যান্য পণ্য ও পরিষেবার দামেও চাপ তৈরি হচ্ছে।

এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে ভোক্তা আস্থায়ও। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচক অনুযায়ী, ভোক্তা আস্থা রেকর্ড নিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, যা অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগের প্রতিফলন।

রাজনৈতিক অঙ্গনেও এই ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মূল্যস্ফীতি ইস্যুটি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চাপ তৈরি করছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

অনেক ভোক্তা জানিয়েছেন, জ্বালানির দাম এতটাই বেড়েছে যে দৈনন্দিন যাতায়াতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হচ্ছে। কেউ কেউ ব্যক্তিগত গাড়ি কম ব্যবহার করছেন, আবার অনেকে খরচ নিয়ন্ত্রণে ভ্রমণ পরিকল্পনা পরিবর্তন করছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট Donald Trump দাবি করেছেন, এই মূল্যবৃদ্ধি সাময়িক। হোয়াইট হাউসের মতে, কর ছাড়, জ্বালানি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার কারণে অর্থনীতি এখনো শক্ত অবস্থানে রয়েছে। একই সঙ্গে কিছু নিত্যপণ্যের দাম কমেছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, খাদ্য ও জ্বালানি বাদে কোর ইনফ্লেশন তুলনামূলকভাবে কম—মাত্র ২ দশমিক ৬ শতাংশ। এটি কিছুটা স্বস্তির ইঙ্গিত দিলেও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ফেডারেল রিজার্ভ) এখন সুদের হার কমানোর বিষয়ে আরও সতর্ক অবস্থান নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ, মূল্যস্ফীতি আবারও বাড়তে থাকায় নীতিনির্ধারকেরা অতীতের ভুল সিদ্ধান্ত এড়াতে চাইছেন।

সব মিলিয়ে জ্বালানিনির্ভর এই মূল্যস্ফীতি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করেছে। যুদ্ধ, বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট এবং জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা মিলিয়ে পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত। অর্থনীতিবিদদের মতে, আগামী কয়েক মাসই নির্ধারণ করবে এই মূল্যস্ফীতি সাময়িক নাকি দীর্ঘস্থায়ী সংকটে রূপ নেবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত