প্রবীণ আইনজীবী শফিক আহমেদ আর নেই

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৫৬ বার
প্রবীণ আইনজীবী শফিক আহমেদ আর নেই

প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সাবেক আইনমন্ত্রী, দেশের বিচারাঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী শফিক আহমেদ আর নেই। দীর্ঘ আইনজীবী জীবনের অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে তিনি যে অবদান রেখে গেছেন, তা দেশের বিচারব্যবস্থায় দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। রোববার বিকেল ৫টা ৪৫ মিনিটে রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল হাসপাতাল-এ চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯০ বছর।

তার মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আকসির এম চৌধুরী। তিনি জানান, শফিক আহমেদকে শনিবার রাতে শারীরিক অসুস্থতার কারণে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় অবস্থার অবনতি হলে রোববার বিকেলে তিনি মারা যান। মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই আইন অঙ্গন, রাজনৈতিক মহল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে।

শফিক আহমেদের মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তির মৃত্যু নয়, বরং দেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি। তার দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি যেমন একজন দক্ষ আইনজীবী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, তেমনি একজন নীতিবান রাজনীতিক এবং রাষ্ট্রনায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে। তার কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি আইন ও ন্যায়বিচারের প্রতি গভীর অঙ্গীকারের পরিচয় দিয়েছেন।

১৯৩০-এর দশকে জন্ম নেওয়া শফিক আহমেদ শিক্ষা জীবন থেকেই ছিলেন মেধাবী ও অধ্যবসায়ী। আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জনের পর তিনি আইন পেশায় আত্মনিয়োগ করেন এবং ধীরে ধীরে দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবীদের কাতারে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট-এ আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন এবং অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ মামলায় অংশগ্রহণ করেন। তার যুক্তি, বিশ্লেষণ এবং আইনের গভীর জ্ঞান তাকে আইনজীবীদের মধ্যে বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে।

আইন পেশার পাশাপাশি তিনি সংগঠক হিসেবেও ছিলেন অত্যন্ত সক্রিয়। তিনি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং আইনজীবীদের অধিকার রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ বার কাউন্সিল-এর ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এই পদগুলোতে থেকে তিনি আইনজীবীদের পেশাগত মান উন্নয়ন এবং ন্যায়বিচারের পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করেছেন।

২০০৯ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন শুরু করেন। ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি আইনমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার দায়িত্বকালীন সময়ে বিচারব্যবস্থার আধুনিকায়ন, বিচার প্রক্রিয়ার গতি বৃদ্ধি এবং আইন সংস্কারের নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। অনেক গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন এবং সংশোধনের ক্ষেত্রে তার অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

আইনমন্ত্রী হিসেবে তার সময়কাল ছিল নানা চ্যালেঞ্জপূর্ণ। দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে বিচারব্যবস্থাকে কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার জন্য তাকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। সমালোচনা ও বিতর্কের মধ্যেও তিনি তার অবস্থানে অটল ছিলেন এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে অবিচল থেকেছেন। তার নেতৃত্বে বিচার বিভাগকে আরও কার্যকর ও জনমুখী করার প্রচেষ্টা লক্ষ করা গেছে।

শফিক আহমেদের ব্যক্তিগত জীবন ছিল সাদামাটা এবং কর্মমুখর। তিনি সর্বদা ন্যায়বিচার, সততা এবং পেশাগত নীতির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন। সহকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন একজন অভিভাবকসুলভ ব্যক্তি, যিনি তরুণ আইনজীবীদের পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দিতেন। তার প্রজ্ঞা, ধৈর্য এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি তাকে সবার কাছে শ্রদ্ধেয় করে তুলেছিল।

তার মৃত্যুতে আইন অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দেশের বিশিষ্ট আইনজীবী, বিচারপতি এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। অনেকেই তাকে একজন ন্যায়পরায়ণ, সৎ এবং দূরদর্শী ব্যক্তি হিসেবে স্মরণ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে। অনেকেই তার সঙ্গে কাটানো স্মৃতিচারণা করছেন এবং তার অবদানের কথা তুলে ধরছেন।

রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে বলেছেন, শফিক আহমেদের মতো একজন অভিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ ব্যক্তির চলে যাওয়া দেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। তার অভিজ্ঞতা, জ্ঞান এবং নেতৃত্ব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

তার জানাজার সময় ও দাফনের বিষয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে পরে জানানো হবে বলে জানা গেছে। ইতোমধ্যে তার আত্মীয়স্বজন, সহকর্মী এবং শুভানুধ্যায়ীরা হাসপাতালে ভিড় জমিয়েছেন। সবাই শেষবারের মতো তাকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য উপস্থিত হচ্ছেন।

বাংলাদেশের আইন ও বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে শফিক আহমেদের নাম একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে। তার অবদান, আদর্শ এবং কর্মজীবনের শিক্ষা দেশের আইন অঙ্গনে দীর্ঘদিন পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে। তার মৃত্যুতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তবে তার রেখে যাওয়া মূল্যবোধ ও নীতিই ভবিষ্যতের জন্য দিকনির্দেশনা হয়ে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত