প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবুল কালাম আজাদ সম্প্রতি এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তাকে এবং তার পরিবারের সদস্যদের মোবাইল ফোনে ধারাবাহিকভাবে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এসব হুমকি শুধু সাধারণ কোনো দুষ্কৃতিকারীর পক্ষ থেকে নয়, বরং ‘বঙ্গবন্ধু গেরিলা বাহিনীর প্রধান’ পরিচয়ে দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
১৭ জুলাই থেকে শুরু করে ২১ জুলাই সকাল পর্যন্ত একাধিকবার, কখনও দিনে কখনও রাতে, সহস্রাধিক মোবাইল কল এসেছে ওসির সরকারি নম্বরে। কলগুলোর প্রতিটিতে শুধু অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ নয়, বরং তাকে এবং তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করার সরাসরি হুমকি দেওয়া হয়েছে। ওসি আজাদ নিজেই বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন এবং জানিয়েছেন, তিনি এই ধরনের হুমকিতে ভীত নন, বরং পেশাদারিত্বের সঙ্গে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এই ঘটনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে একটি অডিও রেকর্ড। ৮ মিনিট ৫ সেকেন্ডের সেই অডিও ক্লিপটি ইতোমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে, যা ঘিরে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
রেকর্ডকৃত অডিওটিতে ‘বঙ্গবন্ধু গেরিলা বাহিনীর প্রধান’ পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি ওসি আবুল কালাম আজাদকে সরাসরি হুমকি দেন। ১৬ জুলাই এনসিপি’র একটি সমাবেশ ঘিরে গোপালগঞ্জে ঘটে যাওয়া সংঘর্ষের জন্য তিনি পুলিশের ভূমিকা, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের প্রতি সহানুভূতিশীল অবস্থান, নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। অভিযুক্ত ব্যক্তি দাবি করেন, ওসি আজাদ ও তার বাহিনী নাকি এনসিপি সমর্থকদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে হয়রানি করছেন, আটক করছেন এবং নির্যাতন চালাচ্ছেন।
অডিও বার্তায় আরও বলা হয়, “ওসি সাহেব, এটা গোপালগঞ্জ। এখানে কেউ বাড়াবাড়ি করে টিকে থাকতে পারেনি। ৭১-এর চেতনায় আমরা বঙ্গবন্ধু গেরিলা বাহিনী গঠন করেছি। আপনি সংযত হোন, নয়তো ফল ভালো হবে না।”
এই হুমকির পেছনে রাজনৈতিক কোনো গোপন সংঘ বা অনানুষ্ঠানিক মিলিশিয়া গোষ্ঠী জড়িত কি না, তা এখন পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তের বিষয়। ওসি আবুল কালাম আজাদ জানিয়েছেন, “এই ধরণের সমস্যা পুলিশের জন্য নতুন নয়। তবে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি। তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন।”
তিনি আরও বলেন, “এই কয়েক দিনে কয়েক হাজার ফোন এসেছে। গালিগালাজ, হুমকি—সব কিছুই সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অটল আছি। কেউ এসব করে আমাদের ভয় দেখাতে পারবে না।”
ওসিকে হুমকি দেওয়ার ঘটনাটি স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। এনসিপি এবং ক্ষমতাসীন দলগুলোর মধ্যে সম্প্রতি সৃষ্ট উত্তেজনার পেছনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রভাব রয়েছে বলেই অনেকে মনে করছেন। এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অডিও নিয়ে সাধারণ নাগরিকদের মাঝেও উদ্বেগ বিরাজ করছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ‘বঙ্গবন্ধু গেরিলা বাহিনী’ নামধারী যে সংগঠনের কথা বলা হচ্ছে, তার অস্তিত্ব, কাঠামো এবং উদ্দেশ্য নিয়ে এখনই তদন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। এ ধরনের গোষ্ঠীর অস্তিত্ব থাকলে তা রাষ্ট্রের জন্য নিরাপত্তা হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কোটালীপাড়া থানা ও তার আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং পুলিশ নজরদারি বৃদ্ধি করেছে। স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি শান্ত রাখার চেষ্টা করছে, তবে হুমকির পেছনে থাকা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার দায়িত্ব এখন তদন্ত সংস্থার কাঁধে।
একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তা ও তার পরিবারকে এভাবে হুমকি প্রদান শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়, রাষ্ট্রের ভিতরে গোপন সহিংস শক্তির উত্থানের ইঙ্গিতও হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একটি বাংলাদেশ অনলাইন