সীমান্ত পারের আগেই গ্রেপ্তার আলোচিত সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬
  • ৭ বার
সীমান্ত পারের আগেই গ্রেপ্তার আলোচিত সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন

প্রকাশ: ৩০ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চট্টগ্রামের অপরাধ জগতের ত্রাস, খুনের নেশায় বুঁদ থাকা এবং একের পর এক চাঞ্চল্যকর অপরাধ ঘটিয়ে দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন ওরফে মোবারক হোসেন অবশেষে পুলিশের জালে ধরা পড়েছেন। গত দেড় বছর ধরে যিনি বন্দরনগরী চট্টগ্রামে জোড়া খুন থেকে শুরু করে নির্বিচারে চাঁদাবাজি, বিশিষ্ট ব্যবসায়ীর বাড়িতে সশস্ত্র হামলা, কলোনিতে ঢুকে ঠাণ্ডা মাথায় খুন এবং মুঠোফোনে হুমকি দিয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন, সেই ইমন সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে যশোরের কোতোয়ালি থানাধীন ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে তিন সহযোগীসহ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। তাঁর এই গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের এক বড় আতঙ্কের অবসান হতে চলেছে বলে মনে করছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে বসেই অপরাধ সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণকারী চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের অত্যন্ত আস্থাভাজন ও ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত এই ডেভিড ইমন। সাধারণ এক কৃষকের সন্তান থেকে কীভাবে অল্পদিনের ব্যবধানে অপরাধ জগতের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে উঠলেন, তার পেছনের ইতিহাস রীতিমতো লোমহর্ষক। ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার সাধারণ কৃষক মো. মুসার ছেলে মোবারক হোসেন কারাগারে ছোট সাজ্জাদের সংস্পর্শে আসার পর থেকেই অপরাধের অন্ধকার পথে পা বাড়ান। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জামিনে কারামুক্ত হয়ে তিনি বেপরোয়া হয়ে ওঠেন এবং ছোট সাজ্জাদের অবর্তমানে আরেক সহযোগী রায়হানকে সঙ্গে নিয়ে পুরো অপরাধ চক্রের নেতৃত্ব নিজের হাতে তুলে নেন। এরপর থেকে তাঁর একক ইশারায় চট্টগ্রামের হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া এবং মহানগরের চান্দগাঁও, বায়েজিদ ও পাঁচলাইশ এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে রক্তস্নাত অধ্যায়ের সূচনা হয়।

পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, দুবাইয়ে বসেই সব অপকর্মের ছক কষলেও সম্প্রতি ভারতে এসে সেখান থেকে অবৈধ উপায়ে মাত্র চার দিন আগে যশোর সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রবেশ করেন ডেভিড ইমন। দেশে ঢোকার পরপরই গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারিতে চলে আসে। পুলিশ যখন তাঁকে ধরার জন্য সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করে, ঠিক তখনই গোপন সূত্রে সেই অভিযানের আভাস পেয়ে যান এই শীর্ষ সন্ত্রাসী। এরপর তড়িঘড়ি করে যশোরের ঝিকরগাছা সীমান্ত দিয়ে পুনরায় ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালান তিনি। কিন্তু যশোর জেলা পুলিশ, জেলা গোয়েন্দা শাখা এবং চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের সমন্বিত ও সাঁড়াশি অভিযানে ঝুমঝুমপুর এলাকার চেকপোস্টে পথিমধ্যে আটকে ফেলা হয় তাঁকে। আটকের পর ভুয়া পরিচয় ও নাম ব্যবহার করে বাঁচার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত পুলিশের সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা প্রমাণের সামনে টিকতে পারেননি তিনি।

ডেভিড ইমনের অপরাধের তালিকা দীর্ঘ ও লোমহর্ষক। গত দেড় বছরে চট্টগ্রামে জোড়াসহ অন্তত এগারোটি খুনের ঘটনায় তাঁর নাম প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়া এলাকায় মাইক্রোবাসের গতি রোধ করে জোড়া খুন এবং একই বছরের ২৩ মে রাতে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে আলোচিত ঢাকাইয়া আকবর হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা হিসেবে তাঁর নাম আসে। এ ছাড়া ১৫ মামলার আসামি দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী সরোয়ার বাবলার খুনসহ প্রতিটি অপরাধেই ত্রাসের প্রতিচ্ছবি ছিলেন ইমন। তাঁর ব্যবহৃত ফিল্মি স্টাইলের হুমকি এবং ঔদ্ধত্যপূর্ণ ডায়ালগগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক ভাইরাল হয়েছিল। ব্যবসায়ীদের ফোন করে এককালীন মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চাঁদার টাকা না পেলে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি চালিয়ে দোকানপাট ও নির্মাণাধীন ভবন ভাঙচুর করা ছিল তাঁর নিত্যদিনের রুটিন।

সর্বশেষ গত ১১ জুলাই চট্টগ্রাম নগরের চকবাজার এলাকার একটি ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের মালিককে ফোন করে দুই কোটি টাকা এককালীন এবং প্রতি মাসে দশ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন তিনি। নির্ধারিত দুই দিনের ডেডলাইন শেষ হওয়ার পর চাঁদা না দেওয়ায় তাঁর সশস্ত্র অনুসারীরা ওই প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চালায়। এর আগে গত ১০ মে চট্টগ্রামের জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও সাংবাদিক বিপ্লব দেকে ফোন করে পঞ্চাশ লাখ টাকা চাঁদা না দিলে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে গুলি করে শরীর ঝাঁঝরা করে দেওয়ার হুমকি দেন। একইভাবে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি চট্টগ্রামের এক শ্রমিকদল নেতাকে ফোন করে পুলিশ প্রহরায় থেকেও বাঁচতে পারবেন না বলে ভয় দেখান। শুধু তাই নয়, গত বছরের আগস্ট মাসে স্মার্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমানের বাসভবনে পরপর দুই দফায় সশস্ত্র হামলা চালিয়ে গুলি বর্ষণ করা হয়। একই বছরের ডিসেম্বরে পাঁচলাইশের হামজারবাগে একটি নির্মাণাধীন ভবনে এবং মোহরায় এক সাধারণ বাসিন্দার বাসায় হামলা চালিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করে ইমন-রায়হান বাহিনী।

পুলিশের তথ্যমতে, ডেভিড ইমনের কাছে ১৫ থেকে ২০টি অত্যাধুনিক বিদেশি পিস্তল ও ভারী অস্ত্র রয়েছে এবং তিনি অস্ত্র চালনায় অত্যন্ত পারদর্শী। তাঁর এবং তাঁর সহযোগীদের ভয়ে চট্টগ্রামের অন্তত ১৫ লাখ মানুষের জীবন এক প্রকার জিম্মি হয়ে পড়েছিল। সাধারণ মানুষের মনে চরম আতঙ্ক তৈরি করতে তিনি মাঝে মাঝে পুলিশ প্রশাসনকে জড়িয়েও ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর ভিডিও বার্তা ছড়াতেন। যশোর থেকে গ্রেপ্তার করার পর তাঁকে বিমান বা কঠোর নিরাপত্তার মাধ্যমে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এদিকে ডেড় বছর ধরে ত্রাস সৃষ্টি করা এই সন্ত্রাসীর আটকের খবরে চট্টগ্রাম অঞ্চলের ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে। তবে এই চক্রের অন্যতম অপর সহযোগী রায়হানকে ধরতে নোয়াখালীর সেনবাগে অভিযান চালানো হলেও তিনি দেয়াল টপকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। পুলিশ জানিয়েছে, পলাতক রায়হানকে গ্রেফতারেও সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং খুব দ্রুতই অপরাধ সাম্রাজ্যের বাকিদের আইনের আওতায় আনা হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত