ইউনূসকে ছাড় নয়, তদন্ত চান আনিস আলমগীর

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৯ বার
ইউনূস শ্বেতপত্র তদন্ত দাবি

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অভিযোগ ও সমালোচনা ঘিরে জনমনে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। এই প্রেক্ষাপটে সিনিয়র সাংবাদিক আনিস আলমগীরের এক বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

সোমবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে আনিস আলমগীর স্পষ্ট ভাষায় বলেন, অতীতে যেভাবে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দিন আহমদ এবং সেনা সমর্থিত প্রশাসনের অন্যতম ব্যক্তি মইন উদ্দিন আহমদকে ছাড় দেওয়া হয়েছিল, একই ধরনের ‘ছাড়’ বর্তমান পরিস্থিতিতে ড. ইউনূসকে দেওয়া উচিত হবে না। তিনি মনে করেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ক্ষমতায় থাকা যেকোনো সরকারের কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি এবং জনগণের জানার অধিকারকে গুরুত্ব দিতে হবে।

তার এই মন্তব্যের পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক একটি বিতর্ক, যেখানে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বাস্থ্য খাতে বিশেষ করে টিকা কেনা ও সরবরাহে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। আনিস আলমগীর তার পোস্টে বলেন, বিচ্ছিন্নভাবে অভিযোগ তুলে কোনো ফল পাওয়া যাবে না। বরং ইউনূসের নেতৃত্বাধীন ১৮ মাসের শাসনামলের একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশ করা উচিত, যাতে জনগণ স্পষ্টভাবে জানতে পারে ওই সময়কার নীতিনির্ধারণ, অর্থ ব্যয় এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো কেমন ছিল।

এদিকে একই দিনে সুপ্রিম কোর্টের দুই আইনজীবী বিপ্লব কুমার দাশ ও ব্যারিস্টার সানাউল্লাহ নূরে সাগর দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি আবেদন জমা দিয়েছেন। আবেদনে তারা সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা ড. নূরজাহান বেগমসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে টিকা কেনায় সম্ভাব্য অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

আবেদনে উল্লেখ করা হয়, দেশে সাম্প্রতিক সময়ে হামের প্রকোপ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এর ফলে শিশু মৃত্যুর ঘটনাও বেড়েছে। এই পরিস্থিতির জন্য পূর্ববর্তী সরকারের নীতিগত ব্যর্থতা ও অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন অনেক নাগরিক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন গণমাধ্যমেও এ বিষয়ে মতামত প্রকাশ পেয়েছে, যা বিষয়টিকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে।

আইনজীবীরা তাদের আবেদনে আরও উল্লেখ করেন, স্বাস্থ্য খাতে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় সময়ে টিকা সংগ্রহ এবং তা কার্যকরভাবে বিতরণে ব্যর্থতা গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়। বিশেষ করে হামসহ অন্যান্য সংক্রামক রোগের টিকা ও সিরিঞ্জের ঘাটতি বর্তমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে হাজার হাজার শিশু ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে লড়াই করছে।

আবেদনে দাবি করা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা কেনার পদ্ধতিতে হঠাৎ পরিবর্তন আনা হয়েছিল, যা কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই বাস্তবায়ন করা হয়। এর ফলে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয় এবং প্রয়োজনীয় টিকা সময়মতো সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে এসব সিদ্ধান্তের পেছনে কী কারণ ছিল এবং কীভাবে অর্থ ব্যয় হয়েছে, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য প্রকাশ না করায় স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে টিকা ও সরঞ্জামের ঘাটতির জন্য পূর্ববর্তী প্রশাসনের সিদ্ধান্তকে দায়ী করা হয়েছে। এতে করে বিষয়টি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উভয় ক্ষেত্রেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ, যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না থাকলে তা মহামারি আকার ধারণ করতে পারে। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শতাধিক শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। পাশাপাশি আরও বহু শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে, যাদের অবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই সংকটাপন্ন।

এই পরিস্থিতিতে আইনজীবীরা মনে করেন, জনস্বার্থে বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত অত্যন্ত জরুরি। তারা দুর্নীতি দমন কমিশনকে অনুরোধ জানিয়েছেন, টিকা ক্রয়, সংরক্ষণ এবং বিতরণ প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে।

আনিস আলমগীরের বক্তব্য এবং আইনজীবীদের আবেদন—দুইয়ের সমন্বয়ে বিষয়টি এখন জাতীয় আলোচনায় পরিণত হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এটি শুধু একটি ব্যক্তিকে ঘিরে বিতর্ক নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অতীতের যেকোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করা এবং প্রয়োজনে তা নিয়ে তদন্ত করা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে তা হতে হবে নিরপেক্ষ, তথ্যভিত্তিক এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত। অন্যদিকে কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, এ ধরনের ইস্যু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার রূপ নিতে পারে, যা দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে।

সব মিলিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরে ওঠা এই বিতর্ক এবং স্বাস্থ্য খাতের অনিয়মের অভিযোগ এখন দেশের অন্যতম আলোচিত বিষয়। জনমনে প্রশ্ন জাগছে—আসলে কী ঘটেছিল সেই সময়ে? সত্য উদঘাটনে কি কোনো নিরপেক্ষ তদন্ত হবে? আর যদি হয়, তবে তার ফলাফলই বা কী দাঁড়াবে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই হয়তো নির্ধারণ করবে আগামী দিনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আলোচনার দিকনির্দেশনা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত