প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্প নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি শ্লথ হওয়ার পর এবার যুক্তরাষ্ট্রেও বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের পতনের তথ্য সামনে এসেছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এই বাজারে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৭ শতাংশের বেশি কমেছে। ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান খাতটি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও রপ্তানি সংশ্লিষ্টদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ক্রেতাদের ব্যয় সংকোচন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতির পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে পড়তে শুরু করেছে। টানা কয়েক মাস ধরে বাজারে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা এখন রপ্তানি পরিসংখ্যানে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেল (ওটেক্সা) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৭ দশমিক ২১ শতাংশ কমেছে। এটি সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অন্যতম বড় পতন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ মোট ২৯৮ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। গত বছরের একই সময়ে এই আয় ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ফলে চার মাসের ব্যবধানে রপ্তানি আয় কমেছে ১১ দশমিক ২৪ শতাংশ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু রপ্তানি আয় নয়, পণ্যের গড় মূল্য এবং রপ্তানির পরিমাণ—উভয় ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। এ সময়ে ইউনিটপ্রতি গড় রপ্তানি মূল্য কমেছে ২ দশমিক ৪৫ শতাংশ এবং রপ্তানিকৃত পণ্যের পরিমাণ কমেছে ৯ দশমিক ০১ শতাংশ। ফলে মূল্য ও পরিমাণ উভয় দিক থেকেই চাপ তৈরি হওয়ায় মোট রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক আমদানির সামগ্রিক বাজার বর্তমানে সংকুচিত হচ্ছে। দেশটিতে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলেছে। এর ফলে পোশাকসহ অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের ক্ষেত্রে সতর্কতা বাড়িয়েছে মার্কিন ভোক্তারা। ফলে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোও নতুন ক্রয়াদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে সংযত অবস্থান নিয়েছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানিও এ সময়ে প্রায় ১২ শতাংশ কমেছে। সে বিবেচনায় বাংলাদেশের রপ্তানি পতন বৈশ্বিক প্রবণতার অংশ হলেও প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বিশেষ করে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার পারফরম্যান্স বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। একই সময়ে ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তাদের রপ্তানি ১ দশমিক ৩১ শতাংশ বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে কম্বোডিয়া রপ্তানিতে ১৪ দশমিক ০৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ফলে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বাংলাদেশকে আরও কার্যকর কৌশল গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বর্তমানে কম খরচে উচ্চমানের পণ্য সরবরাহ করতে সক্ষম দেশগুলোর দিকে ঝুঁকছেন। উৎপাদন দক্ষতা, দ্রুত সরবরাহ, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং বাণিজ্যিক সুবিধা নিশ্চিত করতে না পারলে বাংলাদেশের জন্য বাজার ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।
তবে সংকটের মধ্যেও কিছু সম্ভাবনার ইঙ্গিত রয়েছে। ওটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনের পোশাক রপ্তানি আয় ৫০ দশমিক ২১ শতাংশ কমেছে। ভারতের রপ্তানিও কমেছে ২৮ দশমিক ০৩ শতাংশ। ফলে এই দুই বড় প্রতিযোগীর বাজার অংশীদারিত্ব কমে যাওয়ায় নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্যও পোশাক খাতের ওপর চাপের বিষয়টি স্পষ্ট করেছে। ২০২৬ সালের মে মাসে বাংলাদেশ থেকে মোট পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৪৪০ কোটি ২৭ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৭ দশমিক ০৭ শতাংশ কম। গত বছরের মে মাসে মোট রপ্তানি আয় ছিল ৪৭৩ কোটি ৭৮ লাখ ডলার।
এর মধ্যে তৈরি পোশাক খাত থেকে মে মাসে আয় হয়েছে ৩৫৯ কোটি ডলার। আগের বছরের একই মাসে এই আয় ছিল প্রায় ৩৯২ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পোশাক রপ্তানি আয় প্রায় ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ কমেছে। দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে এই খাতের দুর্বলতাকেই দায়ী করছেন অর্থনীতিবিদরা।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতির পরিবর্তন রপ্তানির ওপর প্রভাব ফেলছে। তার মতে, অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ফলে পণ্যের দাম বেড়েছে এবং এর চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়েছে। ফলে বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানিও কমেছে।
অন্যদিকে বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক এবং ডেনিম শিল্প উদ্যোক্তা মহিউদ্দিন রুবেল মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সামগ্রিক মন্দা থাকলেও চীন থেকে আমদানি কমে যাওয়ার যে সুযোগ তৈরি হয়েছিল, বাংলাদেশ তা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি। সেই সুযোগ গ্রহণ করেছে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া এবং কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলো।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে শুধু কম দামের উৎপাদননির্ভর মডেল থেকে বেরিয়ে এসে উচ্চমূল্যের পণ্য, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন এবং দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থার দিকে আরও বেশি মনোযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে নতুন বাজার অনুসন্ধান, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখাও জরুরি হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। ফলে এই খাতে দীর্ঘমেয়াদি মন্দা অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই সরকার, উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন বাজার সম্প্রসারণ এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার সময় এসেছে।
বিশ্ববাজারের অনিশ্চয়তার মধ্যেও বাংলাদেশের পোশাক শিল্প এখনও সম্ভাবনাময়। তবে বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে শুধু উৎপাদন নয়, কৌশলগত সক্ষমতা এবং বাজার বৈচিত্র্য বাড়ানোর বিকল্প নেই।