চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকে বাড়ছে খেলাপি ঋণের বোঝা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬
  • ১৫ বার
চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকে বাড়ছে খেলাপি ঋণের বোঝা

প্রকাশ: ২৪ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে এক গভীর ও তীব্র সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। বিশেষ করে বিগত কর্তৃত্ববাদী আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিবেচনা ও প্রীতির সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে চতুর্থ প্রজন্মের বেশ কয়েকটি নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স বা অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, যা পরবর্তীতে দেশের পুরো আর্থিক খাতের জন্য এক মরণঘাতী বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তৎকালীন সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে যাদের হাতে এসব ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছিল, তারা পেশাদারিত্ব ও নিয়মনীতিকে সম্পূর্ণ বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিলে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। যার ফলস্বরূপ বর্তমান সময়ে এসে এই ব্যাংকগুলো দেশের খেলাপি ঋণের হারের দিক থেকে একেবারে শীর্ষস্থানে অবস্থান করছে এবং দেশের গোটা ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। সাম্প্রতিক প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত মার্চ মাসের হিসাব অনুযায়ী চতুর্থ প্রজন্মের এমন মোট নয়টি ব্যাংকের বিতরণকৃত মোট ঋণের মধ্যে驚人ভাবে প্রায় বাহান্ন দশমিক বিশ শতাংশ বা অর্ধেকেরও বেশি অর্থই ইতোমধ্যে খেলাপি হয়ে পড়েছে, যা অর্থনীতিবিদ ও সাধারণ আমানতকারীদের মনে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদদের জোরালো মতে, চতুর্থ প্রজন্মের এই ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিকভাবে আকাশচুম্বী হয়ে ওঠার পেছনে মূলত বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও কাঠামোগত কারণ জড়িত রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে রয়েছে রাজনৈতিক প্রভাবে ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদান, ব্যাংক পরিচালনায় সুশাসনের চরম অভাব, পরিচালনা পর্ষদের পক্ষ থেকে ঋণ বিতরণের কার্যক্রমে অতিরিক্ত ও অনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং প্রভাবশালী স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও বিভিন্ন ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠানে নিয়মবহির্ভূতভাবে বিপুল পরিমাণ ঋণ বিতরণ করা। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকর তদারকি ও নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার অভাবের সুযোগ নিয়ে অতীতে বিভিন্ন সময়ে পুরোনো খেলাপি ঋণগুলোকে নিয়মবহির্ভূতভাবে পুনঃতফসিলীকরণ এবং বিশেষ সুবিধার আড়ালে প্রকৃত খেলাপি ঋণের ভয়াবহ চিত্র দীর্ঘদিন ধরে সুকৌশলে আড়াল করে রাখা হয়েছিল। তবে গত ২০২৪ সালের পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও এ খাতের কিছু ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে বড় ধরনের পরিবর্তন আসার পর যখন আসল তথ্যগুলো বেরিয়ে আসতে শুরু করে, তখন থেকেই এই ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার জ্যামিতিক হারে বাড়তে শুরু করে।

রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন পাওয়া আলোচিত এই নয়টি ব্যাংকের তালিকায় রয়েছে মধুমতি ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স বা এসবিএসি ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং এনআরবি কমার্শিয়াল বা এনআরবিসি ব্যাংক। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ এবং সংকটাপন্ন অবস্থায় ছিল পদ্মা ব্যাংক, যা শুরুতে দ্য ফারমার্স ব্যাংক নামে যাত্রা শুরু করেছিল। ২০১৩ সালে কার্যক্রম শুরুর আগমুহূর্ত থেকেই ব্যাংকটির নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র প্রকাশ পেতে শুরু করেছিল। অনুমোদন পাওয়ার আগেই অফিস খুলে লোকবল নিয়োগ দেওয়া এবং রাজনৈতিক সম্পর্কের জোরে বিভিন্ন সরকারি ও আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ আমানত সংগ্রহ করে তা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে আত্মসাৎ করার মহোৎসব শুরু হয়েছিল। ফলে চালুর চার বছর পার না হতেই ব্যাংকটি চরম তারল্য সংকটে নিমজ্জিত হয় এবং পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটলে ২০১৭ সালে তৎকালীন চেয়ারম্যান ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরকে পদ ছাড়তে বাধ্য করা হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর পদক্ষেপে ব্যাংকটির তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক একেএম শামীমকেও অপসারণ করা হয়।

সংকটাপন্ন সেই ফারমার্স ব্যাংককে দেউলিয়া হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য সে সময় সরকারের পক্ষ থেকে চার্টার্ড ব্যাংকগুলোসহ চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ বা আইসিবি থেকে বড় অঙ্কের মূলধন সহায়তা প্রদান করা হয়। সেই সুবাদে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে সরকারি ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধিরা যুক্ত হন এবং পরবর্তীতে চৌধুরী নাফিজ সরাফাতের নেতৃত্বে নতুন পর্ষদ গঠন করা হয়। ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারি ব্যাংকটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় পদ্মা ব্যাংক, কিন্তু নাফিজ সরাফাতের দীর্ঘ মেয়াদেও ব্যাংকটির সার্বিক পরিস্থিতির কোনো উন্নতি ঘটেনি, বরং অনিয়ম ও দুর্নীতির মাত্রা আরও বৃদ্ধি পাওয়ায় দিনে দিনে লোকসানের পরিমাণ স্ফীত হতে থাকে। ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে ২০২৪ সালের প্রথম দিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তীব্র চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত নাফিজ সরাফাতও পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চতুর্থ প্রজন্মের এই ব্যাংকগুলোর সামগ্রিক খেলাপি ঋণের ভয়াবহ চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, বিগত এক বছরের ব্যবধানে এই হার উদ্বেগজনকভাবে আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

২০২৫ সালের মার্চ মাস শেষে চতুর্থ প্রজন্মের এই ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার যেখানে চুয়াল্লিশ দশমিক চার শতাংশের কাছাকাছি ছিল, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ডিসেম্বর মাস শেষে তা বৃদ্ধি পেয়ে এক লাফে একান্ন দশমিক এক শতাংশে গিয়ে ঠেকে এবং চলতি বছরের মার্চ শেষে তা আরও বেড়ে বাহান্ন শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। অথচ একই সময়ে সমগ্র দেশের পুরো ব্যাংকিং খাতের সার্বিক খেলাপি ঋণের গড় হার বত্রিশ দশমিক সাত শতাংশের আশেপাশে থাকলেও চতুর্থ প্রজন্মের এই ব্যাংকগুলোর খেলাপি হার তার তুলনায় প্রায় কুড়ি শতাংশ বেশি রয়েছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি অশনিসংকেত। পৃথকভাবে ব্যাংকগুলোর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে সবচেয়ে ভয়াবহ ও চরম বিপর্যয়কর অবস্থায় রয়েছে ইউনিয়ন ব্যাংক, যেখানে খেলাপি ঋণের হার অবিশ্বাস্যভাবে ছিয়ানব্বই দশমিক সাত নয় শতাংশে পৌঁছেছে। এছাড়া গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে খেলাপির হার ছিয়ানব্বই দশমিক চার ছয় শতাংশ এবং একসময়ের ফারমার্স ব্যাংক তথা বর্তমান পদ্মা ব্যাংকে এই হার নব্বই দশমিক ছয় আট শতাংশ। তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম হলেও এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকে বাইশ দশমিক চার আট শতাংশ, এসবিএসি ব্যাংকে আঠारো দশমিক ছয় এক শতাংশ, মিডল্যান্ড ব্যাংকে চার দশমিক তিন সাত শতাংশ এবং মধুমতি ব্যাংকে দুই দশমিক আট দুই শতাংশ খেলাপি ঋণ রয়েছে।

চতুর্থ প্রজন্মের এসব ব্যাংকের এই অস্বাভাবিক খেলাপি ঋণের কারণে তাদের নিজস্ব সম্পদের গুণগত মান, সার্বিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যতে ঋণ আদায় বা পুনরুদ্ধারের সক্ষমতা নিয়ে ব্যাংক খাতের বিশেষজ্ঞদের মনে নতুন করে গভীর আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলা হয়েছে যে, চতুর্থ প্রজন্মের কয়েকটি ব্যাংকের অ্যাডভান্স-টু-ডিপোজিট রেশিও বা এডিআর এখনো একশ শতাংশের সীমানা অতিক্রম করে অনেক উপরে অবস্থান করছে। গত মার্চ মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ শ্রেণির ব্যাংকগুলোর গড় এডিআর ছিল একশ এক দশমিক ছয় শতাংশ, যা মূলত ব্যাংকগুলোর তারল্য ঝুঁকিকে অত্যন্ত বিপজ্জনক মাত্রায় বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর অর্থ হলো ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত কঠোর ঋণসীমা বা প্রবিধান লঙ্ঘন করে খেয়ালখুশি অনুযায়ী জনগণের আমানতের টাকা ঋণ হিসেবে বিতরণ করে চলেছে। চতুর্থ প্রজন্মের এই নতুন ব্যাংকগুলোর পরেই দেশের ব্যাংকিং খাতে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে প্রথম প্রজন্মের ব্যাংকগুলো, যেখানে খেলাপি ঋণের হার বর্তমানে চৌত্রিশ দশমিক চার শূন্য শতাংশ। এরপরে ক্রমানুসারে রয়েছে তৃতীয় প্রজন্মের ব্যাংক, যাদের খেলাপি ঋণের হার উনত্রিশ দশমিক আট শতাংশ এবং দ্বিতীয় প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর খেলাপির হার উনিশ দশমিক বিশ শতাংশ, যেখানে পঞ্চম প্রজন্মের ব্যাংকে এই হার কিছুটা কম অর্থাৎ পাঁচ শতাংশের ঘরে রয়েছে।

খাতভিত্তিক খেলাপি ঋণের একটি বিশদ বিশ্লেষণে দেখা যায় যে দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসার বিভিন্ন খাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আঘাত এসেছে ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে, যেখানে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে তেতাল্লিশ দশমিক আট শূন্য শতাংশ। এর ঠিক পরেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ঋণ খাত, যেখানে একিউরড খেলাপি ঋণের হার একত্রিশ দশমিক ৯০ শতাংশ। এছাড়া দেশের আবাসন ও নির্মাণ খাতে উনত্রিশ দশমিক ৯০ শতাংশ, কৃষি, মৎস্য ও বনায়ন খাতে উনত্রিশ দশমিক ৯০ শতাংশ, পরিবহন খাতে পঁচিশ দশমিক ৭০ শতাংশ, ভোক্তা ঋণে সাত দশমিক ১০ শতাংশ এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন ঋণে খেলাপি ঋণের হার পনেরো শতাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। ঋণের পরিমাণভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস পর্যালোচনায় আরও দেখা যায় যে মাঝারি ও ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতাদের তুলনায় বড় অঙ্কের ঋণগুলোর মাধ্যমেই মূলত অর্থ আত্মসাৎ ও খেলাপি হওয়ার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। গত বছরের মার্চ মাসের হিসাব অনুযায়ী এক কোটি টাকা পর্যন্ত খেলাপি ঋণের হার পনেরো শতাংশ থাকলেও এক কোটি এক টাকা থেকে দশ কোটি টাকার মধ্যে তা বেড়ে ছাব্বিশ দশমিক ৬০ শতাংশে দাঁড়ায়। অন্যদিকে আরও বড় অংকের ঋণ তথা দশ কোটি এক টাকা থেকে বিশ কোটি টাকার ঋণে খেলাপি হার পঁয়তাল্লিশ দশমিক ১০ শতাংশ, কুড়ি কোটি এক টাকা থেকে ত্রিশ কোটি টাকায় পঁয়ত্রিশ দশমিক ৭০ শতাংশ, ত্রিশ কোটি এক টাকা থেকে চল্লিশ কোটি টাকায় আটত্রিশ দশমিক ৯০ শতাংশ, চল্লিশ কোটি এক টাকা থেকে পঞ্চাশ কোটি টাকায় চুয়াল্লিশ দশমিক সত্তর শতাংশ এবং পঞ্চাশ কোটি টাকার তদূর্ধ্ব বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণের হার বায়ান্ন দশমিক ৫০ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় যত্রতত্র ব্যাংক বিতরণের এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত এবং সুশাসনের অভাবে দেশের ব্যাংকিং খাত আজ এক অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে, যা থেকে উত্তরণের জন্য কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প নেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত