প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আফ্রিকার উত্তাল সাহেল অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ বুরকিনা ফাসোর বর্তমান রাজনৈতিক দৃশ্যপটে এক গভীর ও অপ্রত্যাশিত রূপান্তর লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা পুরো দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে নতুন এক চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। দেশটির তরুণ ও ক্ষমতাবান অন্তর্বর্তীকালীন নেতা ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ত্রাওরে একসময় ক্ষমতায় আরোহণের পর থেকেই দেশটির প্রভাবশালী মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের কাছ থেকে ব্যাপক সমর্থন পেয়ে আসছিলেন এবং সেই সুদৃঢ় সমর্থনের ওপর ভর করেই তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালীরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই ঐতিহাসিক মিত্রতা ও অলিখিত সমঝোতা আজ চূড়ান্ত অবনতির দিকে মোড় নিয়েছে এবং সরকারের নেওয়া কিছু কঠোর নীতি ও বিতর্কিত আইনের কারণে রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে দেশের প্রভাবশালী মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরোধ চরম আকার ধারণ করেছে। সম্প্রতি ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক একটি নতুন ও কঠোর আইন পাস হওয়া, দেশের শীর্ষস্থানীয় বেশ কজন প্রভাবশালী ইমাম ও ধর্মীয় পণ্ডিতকে আকস্মিক গ্রেপ্তার করা এবং ধর্মীয় উগ্রবাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয়ভাবে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনার মতো ঘটনাগুলো এই দ্বন্দ্বকে ইতিহাসের এক চরম বিন্দুতে নিয়ে এসে দাঁড় করিয়েছে।
এই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত মূলত গত ২০ জুন তারিখে অন্তর্বর্তীকালীন পার্লামেন্টে সর্বসম্মতিক্রমে পাস হওয়া বিতর্কিত ‘ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক আইন’-কে কেন্দ্র করে, যার ফলে দেশের সামগ্রিক ধর্মীয় কার্যক্রম এবং বিদেশে ইসলামিক শিক্ষা গ্রহণের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে জোরালোভাবে দাবি করা হচ্ছে যে রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে আরও বেশি শক্তিশালী এবং দীর্ঘস্থায়ী করার লক্ষ্যেই মূলত এই নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। এই নতুন আইনে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে ধর্মের নামে শিশুদের দিয়ে জোরপূর্বক ভিক্ষাবৃত্তি করানো কিংবা যেকোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেনে অস্বচ্ছতা বজায় রাখার মতো কর্মকাণ্ডগুলো গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং এর জন্য কঠোর জরিমানা ও দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। সরকারের এই ধরনের পদক্ষেপে মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি বিশাল অংশের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে এবং তারা অভিযোগ করছেন যে এই আইনের আড়ালে মূলত স্বাধীন ধর্মীয় কার্যক্রমের ওপর রাষ্ট্রের দমনমূলক নিয়ন্ত্রণ ও হস্তক্ষেপ অপ্রয়োজনীয়ভাবে বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
আইন পাস হওয়ার পর থেকেই সরকারের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ধর্মীয় নেতারা সোচ্চার হতে শুরু করেন এবং এর প্রতিবাদে অন্যতম প্রভাবশালী সুন্নি আলেম ইমাম মোহাম্মদ ইসহাক কিন্দো নতুন এই আইনের তীব্র সমালোচনা করেন। এর ঠিক পরপরই গত মে মাসের শেষ দিকে তাঁকে অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে গ্রেপ্তার করা হয়, যা মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রতিবাদের দাবানল প্রজ্বালিত করে। কিন্দোর নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে রাজধানী উয়াগাদুগুর রাজপথে যখন তীব্র বিক্ষোভ শুরু হয়, তখন অন্তর্বর্তীকালীন নেতা ইব্রাহিম ত্রাওরে সেই আন্দোলনকে অত্যন্ত কঠোরহস্তে দমন করেন এবং সেটিকে ‘উগ্রপন্থী একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর অসৎ তৎপরতা’ বলে উড়িয়ে দেন। শুধু তাই নয়, বিক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা রাজধানী উয়াগাদুগুর সবচেয়ে বড় সুন্নি মসজিদটি সরকার সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয় এবং নিরাপত্তাসূত্র ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সে সময় প্রতিবাদী প্রায় একশ জন সমর্থককে একটি কঠোর সামরিক শিবিরে ধরে নিয়ে গিয়ে জোড়পূর্বক তথাকথিত ‘নাগরিক প্রশিক্ষণ’ দেওয়া হয়। এর আগে চলতি বছরের এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে বোবো-দিউলাসো শহরে আরেক প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় আলেম মাহমুদ বারোকেও একইভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, যা দেশের ধর্মীয় মহলে চরম আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
পরিস্থিতি যখন দিন দিন আরও বেশি জটিল ও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে, তখন ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ত্রাওরে গত কিছুদিন ধরে অত্যন্ত স্পষ্ট ও আপসহীন ভাষায় ঘোষণা দিয়েছেন যে বুরকিনা ফাসোর পবিত্র মাটিতে কোনো ধরনের ‘মৌলবাদী ইসলামের’ বিন্দুমাত্র স্থান দেওয়া হবে না। যাঁরা ধর্ম ও বিশ্বাসের নামে সমাজে উগ্রবাদ উসকে দেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে বলেও তিনি জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন। যেসব ধর্মীয় পণ্ডিত বা আলেমদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় উগ্রবাদ ও অন্ধত্ব ছড়ানোর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে ত্রাওরে অত্যন্ত জোরালো কণ্ঠে বলেছেন যে যদি এটাই তাঁদের কাঙ্ক্ষিত ইসলাম হয়, তবে সরকার তার বিরুদ্ধে আমৃত্যু লড়াই চালিয়ে যাবে। উগ্রবাদীদের তাদের ধ্বংসাত্মক মানসিকতা অবশ্যই বদলাতে হবে এবং যদি তারা তা না বদলায়, তবে মনে রাখতে হবে যে রাষ্ট্র ইতিমধ্যেই তাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত লড়াই শুরু করে দিয়েছে। তাঁর মতে, পবিত্র ধর্ম কখনোই সহিংসতা, জোরজবরদস্তি কিংবা উগ্রতার মাধ্যমে প্রসার লাভ করতে পারে না, বরং ধর্মের প্রকৃত প্রচার ও প্রসার হওয়া উচিত মানুষের ব্যক্তিগত সুন্দর আচরণ এবং নিষ্কলুষ উদাহরণের মাধ্যমে।
ধর্মীয় শিক্ষার বিস্তার এবং বিদেশে শিক্ষার্থী পাঠানোর ক্ষেত্রেও সরকার এক কঠোর ও নজিরবিহীন নীতি গ্রহণ করেছে, যা এই দ্বন্দ্বকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। গত জুনের শেষ দিকে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে স্পষ্ট নির্দেশ জারি করা হয় যে এখন থেকে দেশের বাইরে যেকোনো দেশে উচ্চশিক্ষা বা ধর্মীয় শিক্ষার উদ্দেশ্যে যেতে হলে অবশ্যই দেশের উচ্চশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের থেকে বাধ্যতামূলক আগাম অনুমোদন নিতে হবে। সরকারের দাবি অনুযায়ী, দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও জাতীয় অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই কেবল বিদেশে শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন আরব দেশে ইসলামি আইন ও শরিয়াহ নিয়ে পড়াশোনা করার জন্য বুরকিনা ফাসোর প্রায় আট লাখের বেশি শিক্ষার্থী বিদেশে অবস্থান করছেন, কিন্তু সরকারের অভিযোগ হলো তারা সেখানে গিয়ে কোনো ধরনের ব্যবহারিক পেশাগত দক্ষতা বা আধুনিক জ্ঞান অর্জন করছেন না। এই প্রেক্ষাপটে ত্রাওরে ঘোষণা দিয়েছেন যে আরব দেশগুলোতে ইসলামি আইন নিয়ে অধ্যয়নরত এই বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশের মাটিতে ফিরিয়ে আনা হবে এবং যাঁরা সরকারের এই নির্দেশ অমান্য করে দেশে ফিরে আসতে অস্বীকৃতি জানাবেন, তাঁদের রাষ্ট্রীয় নাগরিকত্ব পর্যন্ত বাতিল করে দেওয়া হতে পারে।
অভ্যন্তরীণ এই তীব্র রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উত্তেজনার মধ্যেই আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রেও বুরকিনা ফাসোর সরকারের নীতিতে এক অদ্ভুত ও নাটকীয় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বিশেষভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। हाल ही में বুরকিনা ফাসোয় নিযুক্ত নতুন ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত সিমন সেরুসি অন্তর্বর্তী নেতা ইব্রাহিম ত্রাওরের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের পরিচয়পত্র পেশ করেছেন এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সাল থেকে ঝুলে থাকা ওই রাষ্ট্রদূতের স্বীকৃতির আবেদনটি সম্প্রতি খুব নীরবে ও গোপনে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ফিলিস্তিনসহ মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর যুদ্ধবাজ ও আগ্রাসী সরকারের একজন প্রতিনিধিকে এভাবে প্রকাশ্যে স্বাগত জানানো এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরালো করার বিষয়টি ত্রাওরের দীর্ঘদিনের বিপ্লবী ভাবমূর্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন অনেকে। ঠিক একই সময়ে ইসরায়েলের শীর্ষ গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো বুরকিনা ফাসো, মালি এবং নাইজারকে নিয়ে গঠিত উদীয়মান আঞ্চলিক সামরিক জোট ‘অ্যালায়েন্স অব সাহেল স্টেটস’-এর সঙ্গে যৌথ নিরাপত্তা সহযোগিতা ও সামরিক অংশীদারিত্ব বাড়ানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে চরম বিরোধের মুখে বৈদেশিক কূটনীতিতে ইসরায়েলের সঙ্গে এই মাখামাখি ত্রাওরের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় টিমবুকটু ইনস্টিটিউটের মতো স্বনামধন্য শান্তি ও নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলো অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় অভিমত প্রকাশ করেছে যে, বর্তমান সরকারের সঙ্গে মুসলিম আলেমদের এই বিরোধ কেবল একটি সদ্য পাস হওয়া নতুন আইন নিয়ে তৈরি হওয়া সাময়িক মতপার্থক্য নয়। বরং এর শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত রয়েছে, কারণ ইব্রাহিম ত্রাওরে ক্ষমতা দখল করার পর থেকে যে অলিখিত ও সুদৃঢ় সমঝোতা বা রাজনৈতিক জোট এই ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে তাঁর তৈরি হয়েছিল, আজ তা পুরোপুরি ভেঙে খানখান হয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতা পাকাপাকি করার ক্ষেত্রে যে আলেম সমাজ অতীতে ত্রাওরের প্রধান শক্তি ও বড় সহায়ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল, আজ তারাই সরকারের কর্তৃত্ববাদী ও একরোখা নীতির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছে। ত্রাওরে একদিকে ঘোষণা দিয়েছেন যে যারা খুতবার মঞ্চে দাঁড়িয়ে উগ্রবাদী চিন্তাধারা প্রচার করবেন, তাঁদের অবিলম্বে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব থেকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়া হবে এবং অন্যদিকে যাঁরা শান্তিপূর্ণ ইসলামের ব্যাখ্যা প্রচার করেন, তাঁদের রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বাত্মক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে আটককৃত জনপ্রিয় ধর্মীয় নেতাদের ভবিষ্যৎ পরিণতি এখনো সম্পূর্ণ অনিশ্চিত ও অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকায় প্রশ্ন উঠেছে যে সরকারের এই পেশিশক্তি ও কঠোর আইন প্রয়োগের নীতি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে কতদূর সফল হবে, নাকি এটি বুরকিনা ফাসোর ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী সামাজিক শক্তি ও ধর্মপ্রাণ জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের একটি রক্তক্ষয়ী ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের স্থায়ী ভিত্তি তৈরি করবে।