প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় গায়িকা, অভিনেত্রী ও ব্যবসায়ী জেনিফার লোপেজ আজ ৫৭ বছরে পা রাখলেন। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সংগীত, চলচ্চিত্র, নৃত্য, প্রযোজনা, ফ্যাশন এবং ব্যবসায় সমান দক্ষতায় নিজের অবস্থান ধরে রাখা এই তারকা শুধু পেশাগত সাফল্যের জন্যই নন, ব্যক্তিগত জীবনের নানা অধ্যায়ের কারণেও বারবার বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এসেছেন। চারবার বিয়ে, চারবারই বিচ্ছেদ, একাধিক আলোচিত প্রেম এবং দীর্ঘ পথচলার অভিজ্ঞতা থেকে সম্পর্ক ও ভালোবাসা নিয়ে তাঁর যে উপলব্ধি তৈরি হয়েছে, তা এখন নতুন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
১৯৬৯ সালের ২৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসে পুয়ের্তো রিকান অভিবাসী পরিবারে জন্ম নেওয়া জেনিফার লোপেজ ছোটবেলা থেকেই নাচ ও গানের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে নাচ শেখা শুরু করেন। পরবর্তীতে অভিনয় ও সংগীত—দুই ক্ষেত্রেই অসাধারণ সাফল্য অর্জন করে তিনি বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী বিনোদন তারকায় পরিণত হন।
১৯৯৭ সালে ‘সেলেনা’ চলচ্চিত্রে কিংবদন্তি শিল্পী সেলেনার চরিত্রে অভিনয় করে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক পরিচিতি পান। এরপর ‘আউট অব সাইট’, ‘দ্য ওয়েডিং প্ল্যানার’, ‘মেইড ইন ম্যানহাটান’, ‘মনস্টার-ইন-ল’, ‘হাসলার’ এবং ‘ম্যারি মি’-এর মতো জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে অভিনয় করে নিজের অবস্থান আরও সুসংহত করেন। একই সময়ে সংগীতশিল্পী হিসেবেও তাঁর জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হয়। ‘ইফ ইউ হ্যাড মাই লাভ’, ‘লাভ ডোন্ট কস্ট আ থিং’, ‘জেনি ফ্রম দ্য ব্লক’, ‘অন দ্য ফ্লোর’ এবং ‘লেটস গেট লাউড’-এর মতো গান তাঁকে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ভক্তের হৃদয়ে জায়গা করে দেয়।
তবে ক্যারিয়ারের উজ্জ্বল সাফল্যের পাশাপাশি ব্যক্তিগত সম্পর্কের উত্থান-পতনও জেনিফার লোপেজকে দীর্ঘদিন আলোচনায় রেখেছে। ১৯৯৭ সালে কিউবান বংশোদ্ভূত ওহানি নোয়ার সঙ্গে তাঁর প্রথম বিয়ে হয়। কিন্তু সেই সম্পর্ক মাত্র এক বছরের মধ্যেই ভেঙে যায়। বিচ্ছেদের পর তাঁদের মধ্যে আইনি বিরোধও সৃষ্টি হয়, যা দীর্ঘদিন গণমাধ্যমের শিরোনামে ছিল।
এরপর ২০০১ সালে ব্যাকআপ নৃত্যশিল্পী ক্রিস জাডকে বিয়ে করেন তিনি। একটি মিউজিক ভিডিওর শুটিং সেটে তাঁদের পরিচয় হয়েছিল। কিন্তু এই সংসারও টেকেনি। প্রায় নয় মাসের মধ্যেই তাঁরা আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
২০০২ সালে অভিনেতা বেন অ্যাফ্লেকের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ানোর পর তাঁদের প্রেমের গল্প হলিউডে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। সংবাদমাধ্যম তাঁদের নাম মিলিয়ে ডাকতে শুরু করে ‘বেনিফার’ নামে। বাগদান পর্যন্ত গড়ালেও শেষ মুহূর্তে সেই বিয়ে আর হয়নি। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তাঁদের সম্পর্ক হলিউডের অন্যতম আলোচিত অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
বেন অ্যাফ্লেকের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর ২০০৪ সালে লাতিন সংগীতশিল্পী মার্ক অ্যান্থনিকে বিয়ে করেন জেনিফার। এটি ছিল তাঁর দীর্ঘতম দাম্পত্য জীবন। ২০০৮ সালে তাঁদের যমজ সন্তান ম্যাক্স ও এমির জন্ম হয়। দীর্ঘ সাত বছর সংসার করার পর ২০১১ সালে তাঁরা আলাদা হওয়ার ঘোষণা দেন এবং ২০১৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিবাহবিচ্ছেদ সম্পন্ন হয়। তবে বিচ্ছেদের পরও সন্তানদের স্বার্থে তাঁরা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন।
২০১৭ সালে সাবেক বেসবল তারকা অ্যালেক্স রদ্রিগেজের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান জেনিফার। ২০১৯ সালে তাঁদের বাগদান সম্পন্ন হয়। কোভিড-১৯ মহামারির কারণে বিয়ের পরিকল্পনা পিছিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত সেই সম্পর্কও স্থায়ী হয়নি। ২০২১ সালে যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে তাঁরা বিচ্ছেদের ঘোষণা দেন।
একই বছর আবারও নতুন করে আলোচনায় আসে জেনিফার ও বেন অ্যাফ্লেকের সম্পর্ক। প্রায় ২০ বছর পর তাঁদের পুনর্মিলন বিশ্বজুড়ে ভক্তদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করে। ২০২২ সালে লাস ভেগাসে ঘরোয়া আয়োজনে তাঁরা বিয়ে করেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ায় বৃহৎ পরিসরে আবারও বিবাহোৎসবের আয়োজন করা হয়। অনেকেই মনে করেছিলেন, বহু বছরের অপেক্ষার পর এবার হয়তো তাঁদের ভালোবাসার গল্প পূর্ণতা পেল।
কিন্তু সেই প্রত্যাশাও শেষ পর্যন্ত পূরণ হয়নি। ২০২৪ সালে জেনিফার লোপেজ বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করেন এবং পরবর্তীতে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁদের বিচ্ছেদ সম্পন্ন হয়। এর মধ্য দিয়ে চারটি বিয়ে এবং চারটি বিচ্ছেদের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন এই বিশ্বখ্যাত শিল্পী।
সম্প্রতি জনপ্রিয় ইন্টারনেট টক শো ‘সাবওয়ে টেকস’-এ অংশ নিয়ে সম্পর্ক, ভালোবাসা এবং বিচ্ছেদ নিয়ে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি খোলাখুলি তুলে ধরেন জেনিফার লোপেজ। তাঁর মতে, একটি সম্পর্কের সমাপ্তি সব সময় ব্যর্থতার প্রতীক নয়। বরং কখনো কখনো সেটিই হতে পারে জীবনের সবচেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত।
তিনি বলেন, বিচ্ছেদের খবর শুনে মানুষের দুঃখ প্রকাশ করার পরিবর্তে অভিনন্দন জানানো উচিত। কারণ, একটি সম্পর্ক শেষ করার সিদ্ধান্ত অনেক সময় উভয় পক্ষের জন্যই ভালো ভবিষ্যতের পথ খুলে দেয়। তাঁর ভাষায়, কেউ যদি বলে, ‘তোমাদের বিচ্ছেদ হয়েছে?’ তখন উত্তর হওয়া উচিত, ‘অভিনন্দন।’ কারণ, তোমরা এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছ, যা হয়তো সবার জন্যই সবচেয়ে ভালো ছিল।
সম্পর্ক ভাঙার প্রসঙ্গে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন জেনিফার। তাঁর মতে, যিনি সম্পর্ক ছেড়ে চলে যান, তিনি সব সময় বিজয়ী নন। বরং মানুষের অনুভূতিকে বারবার আঘাত করা শেষ পর্যন্ত কাউকে প্রকৃত অর্থে সফল করে তোলে না। তিনি বলেন, কেউ যদি সারাজীবন মানুষের হৃদয় ভেঙে বেড়ান, তাহলে প্রকৃত পরাজিত আসলে তিনিই।
বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জেনিফার আরও জানিয়েছেন, বর্তমানে তিনি নিজের সুখের জন্য অন্য কারও ওপর নির্ভর করতে চান না। তাঁর বিশ্বাস, আত্মসম্মান, আত্মবিশ্বাস এবং নিজের প্রতি ভালোবাসাই মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি মনে করেন, একা থাকতে শেখাও জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। কারণ প্রকৃত সুখের শুরু নিজের ভেতর থেকেই।
বিচ্ছেদের পর নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে তিনি ধ্যান, শরীরচর্চা, কাজ এবং সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটানোকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, জীবনের কঠিন সময় মানুষকে আরও পরিণত ও শক্তিশালী করে তোলে।
অভিনয় ও সংগীতের পাশাপাশি জেনিফার লোপেজ নিজেকে একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর নিজস্ব প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ফ্যাশন, সুগন্ধি, প্রসাধনী এবং সৌন্দর্যপণ্য খাতে একাধিক ব্যবসা পরিচালনা করছেন তিনি। ‘জেলো বিউটি’ ব্র্যান্ডসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব থেকেও বিপুল আয় করেন। বিশ্বব্যাপী কনসার্ট, সিনেমা, স্ট্রিমিং প্রকল্প এবং বিজ্ঞাপন মিলিয়ে তিনি আজ একটি বৈশ্বিক ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছেন।
আন্তর্জাতিক আর্থিক বিশ্লেষণভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জেনিফার লোপেজের মোট সম্পদের পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ কোটি মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার মূল্য ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বিশ্বের ধনী নারী বিনোদন তারকাদের তালিকায় তিনি নিয়মিতভাবেই স্থান পান।
৫৭ বছরে পৌঁছেও মঞ্চে তাঁর প্রাণবন্ত উপস্থিতি, নাচ, কণ্ঠ এবং কর্মস্পৃহা এখনো দর্শকদের মুগ্ধ করে। ২০২০ সালের সুপার বোল হাফটাইম শো থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক বিশ্ব সফর পর্যন্ত প্রতিটি আয়োজনে তিনি প্রমাণ করেছেন, বয়স কেবল একটি সংখ্যা। কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা এবং আত্মবিশ্বাস একজন শিল্পীকে দীর্ঘ সময় ধরে সাফল্যের শীর্ষে রাখতে পারে। ব্যক্তিগত জীবনের নানা উত্থান-পতনের মধ্যেও জেনিফার লোপেজ আজও বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল নাম।