প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমেই আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে এবং এর প্রভাব উপকূলীয় অঞ্চল, দ্বীপরাষ্ট্র ও নিম্নভূমি এলাকায় মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণা ও পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, গত এক দশকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হার আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জীবন, জীবিকা এবং আবাসস্থল ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা।
বিজ্ঞানীদের মতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির পেছনে প্রধান দুটি কারণ কাজ করছে। প্রথমত, বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে মেরু অঞ্চলের বরফস্তর এবং হিমবাহ দ্রুত গলছে। দ্বিতীয়ত, সমুদ্রের পানি উষ্ণ হয়ে প্রসারিত হচ্ছে, যা সমুদ্রের আয়তন বৃদ্ধি করছে। এই দুটি প্রক্রিয়া একসঙ্গে কাজ করায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির গতি ক্রমশ বাড়ছে।
গবেষকরা বলছেন, গত শতকের তুলনায় বর্তমান সময়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হার অনেক বেশি। বিশেষ করে গত ১০ বছরে এই পরিবর্তন আরও দ্রুত হয়েছে। স্যাটেলাইট তথ্য, সমুদ্র পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু গবেষণা সংস্থাগুলোর উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এই উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছেন।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি শুধু একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য এবং মানবিক নিরাপত্তার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা এবং ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ার মতো নানা সমস্যা এর সঙ্গে যুক্ত।
বাংলাদেশের মতো নিম্নভূমি ও উপকূলনির্ভর দেশগুলো এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে দীর্ঘমেয়াদে হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। উপকূলীয় এলাকার মানুষ ইতোমধ্যে লবণাক্ততা, ভাঙন এবং জলবায়ুজনিত দুর্যোগের প্রভাব মোকাবিলা করছে।
জলবায়ু গবেষকরা বলছেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার ফলে ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষয়ক্ষতির মাত্রাও বাড়ে। আগে যে মাত্রার জলোচ্ছ্বাস কোনো এলাকায় সীমিত ক্ষতি করত, এখন একই ধরনের পরিস্থিতিতে আরও বড় এলাকা প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এর ফলে ঘরবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সড়ক, কৃষিজমি এবং অন্যান্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক দশকে বিশ্বের বহু উপকূলীয় শহর ও জনবসতি বড় ধরনের ঝুঁকির সম্মুখীন হবে। অনেক মানুষ জলবায়ুজনিত কারণে বাস্তুচ্যুত হতে পারে, যা ভবিষ্যতে বৈশ্বিক মানবিক সংকটের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি শুধু পরিবেশগত ক্ষতি নয়, অর্থনৈতিক ক্ষতিরও কারণ। উপকূলীয় অবকাঠামো রক্ষা, দুর্যোগ মোকাবিলা, কৃষি উৎপাদন হ্রাস এবং জনবসতি স্থানান্তরের মতো বিষয়গুলোতে বিপুল ব্যয় প্রয়োজন হতে পারে। ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর চাপ আরও বাড়বে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় অভিযোজন ও প্রশমন—দুই ধরনের উদ্যোগই জরুরি। একদিকে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে, অন্যদিকে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। বাঁধ নির্মাণ, ম্যানগ্রোভ বন সংরক্ষণ, টেকসই নগর পরিকল্পনা এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
পরিবেশ আন্দোলনকারীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা কোনো একক দেশের পক্ষে সম্ভব নয়। এটি একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ, যার সমাধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য। উন্নত দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোকে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদানও গুরুত্বপূর্ণ।
তারা আরও উল্লেখ করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এটি ইতোমধ্যে বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চরম আবহাওয়া, তাপপ্রবাহ, বন্যা, খরা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি তারই প্রমাণ।
বাংলাদেশের পরিবেশবিদরা মনে করেন, জলবায়ু অভিযোজনের ক্ষেত্রে দেশটি ইতোমধ্যে কিছু অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকার মানুষের জীবন ও জীবিকা সুরক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, গত এক দশকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হার দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ার তথ্য বিশ্ববাসীর জন্য একটি গুরুতর সতর্কবার্তা। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে ভবিষ্যতে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতা মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন এবং টেকসই নীতিমালা গ্রহণের বিকল্প নেই।