প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দক্ষিণ লেবাননের তিবনিন সরকারি হাসপাতালে ভয়াবহ হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে। এই ঘটনায় হাসপাতালটির কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে এবং পুরো এলাকায় মানবিক সংকট আরও গভীর হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার যাচাইকৃত ভিডিও ফুটেজে হাসপাতালের ভেতরের ধ্বংসস্তূপের চিত্র স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। ভিডিওতে হাসপাতালের করিডরজুড়ে ভাঙা কাচ, মাটি ও ধুলো ছড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। বিভিন্ন ওয়ার্ড ও কক্ষের ভেতরে থাকা চিকিৎসা সরঞ্জাম এলোমেলোভাবে পড়ে আছে, অনেক জায়গায় যন্ত্রপাতি সম্পূর্ণভাবে অকার্যকর হয়ে গেছে।
প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, হাসপাতালের বাইরের অংশেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা একাধিক গাড়ি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, হামলার পরপরই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেক মানুষ নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বাধ্য হন।
লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি জানায়, এই হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা জানিয়েছেন, ঘটনাস্থলে দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু করা হলেও হাসপাতালের ভেতরে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের কারণে কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয়নি।
গত ২ মার্চ থেকে লেবাননে চলমান সহিংস পরিস্থিতিতে দুই হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নিহতদের বড় একটি অংশ দক্ষিণ লেবাননের সাধারণ বাসিন্দা। এই দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত অঞ্চলটির সামাজিক ও মানবিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
হাসপাতালের ভেতরের চিত্রে দেখা যায়, চিকিৎসা কক্ষগুলো সম্পূর্ণ এলোমেলো অবস্থায় রয়েছে। শয্যা, ওষুধপত্র এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। চিকিৎসাকর্মীরা জানিয়েছেন, নিরাপত্তাজনিত কারণে অনেকেই হাসপাতালে অবস্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন, যার ফলে জরুরি চিকিৎসা সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
দক্ষিণ লেবাননের এই অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে চলমান উত্তেজনা সাধারণ মানুষের জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় বারবার সংঘর্ষ ও হামলার কারণে স্থানীয় জনগণ চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎসা কেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। হাসপাতাল হলো এমন একটি স্থান যেখানে যুদ্ধ বা সংঘাতকালেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিতে তা বারবার লঙ্ঘিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, হামলার পর পুরো এলাকায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। আহতদের একটি অংশকে বিকল্প চিকিৎসা কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়েছে, যেখানে পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধা নেই বলে জানা গেছে।
মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করেছে। তারা দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা, ওষুধ সরবরাহ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে জরুরি সহায়তা না পৌঁছালে মানবিক সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
আন্তর্জাতিক মহল থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া সীমিত থাকলেও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে। তারা বলছে, চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান লক্ষ্য করে হামলা আন্তর্জাতিক নিয়মের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং এটি যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
তিবনিন সরকারি হাসপাতালের বর্তমান পরিস্থিতি দেখে স্থানীয় চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে হাসপাতালটি পুনরায় কার্যকর করতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা পুনরুদ্ধার না হলে চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু করা কঠিন হবে।
সব মিলিয়ে দক্ষিণ লেবাননের এই হামলা শুধু একটি হাসপাতালের ক্ষতি নয়, বরং পুরো অঞ্চলের মানবিক সংকটকে আরও গভীর করে তুলেছে। সাধারণ মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা এখন চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।