প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় উপকূলের জনপদ খুলনা। এক সময় যেখানে কৃষি ছিল প্রকৃতিনির্ভর ও স্থিতিশীল, আজ সেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রতিনিয়ত নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। কখনো অস্বাভাবিক তাপমাত্রা, কখনো টানা বৃষ্টি, আবার কখনো অনাবৃষ্টি ও লবণাক্ততার বিস্তার—সব মিলিয়ে কৃষি উৎপাদনকে প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
চলতি বছরের মার্চে খুলনায় যেখানে সাধারণত প্রচণ্ড গরম ও আর্দ্রতা থাকে, সেখানে তাপমাত্রার অস্বাভাবিক ওঠানামা দেখা গেছে। একই সঙ্গে এপ্রিল মাসেও আবহাওয়ার এই অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, এই ধরনের পরিবর্তন জলবায়ু পরিবর্তনের সুস্পষ্ট প্রভাব, যা কৃষি ব্যবস্থার ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে।
তবে এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও থেমে নেই উপকূলের কৃষকরা। বরং তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা, স্থানীয় জ্ঞান এবং আধুনিক প্রযুক্তিকে একত্রিত করে গড়ে তুলছেন টিকে থাকার নতুন কৌশল।
খুলনার পাইকগাছা উপজেলার নোয়াকাটি গ্রামের কৃষক রোকেয়া পারভীন জানান, অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে আমন মৌসুমে বীজতলা বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। এমন পরিস্থিতিতে তারা স্থানীয়ভাবে একটি নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করেন। কলাগাছ দিয়ে তৈরি ভেলায় বীজতলা স্থাপন করে পানি থেকে চারা রক্ষা করা হয়। এই পদ্ধতি এখন আশপাশের অনেক কৃষকের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
রোকেয়া পারভীন বলেন, আগে টানা বৃষ্টিতে বীজতলা নষ্ট হয়ে যেত। এখন আমরা ভেলা পদ্ধতিতে চারা তৈরি করছি, ফলে ক্ষতি অনেক কমে এসেছে। এটি আমাদের জন্য একটি কার্যকর সমাধান হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে ডুমুরিয়া উপজেলার খর্ণিয়া গ্রামের কৃষক আবু হানিফ মোড়ল দীর্ঘদিন ধরে সবজি চাষে বৈচিত্র্য এনেছেন। তিনি মাছের ঘেরের আইলে শিম, রঙিন ফুলকপি ও বাঁধাকপির মতো ফসল চাষ করে সফলতা অর্জন করেছেন। তার মতে, কৃষিকে টিকিয়ে রাখতে হলে মৌসুমভিত্তিক পরিকল্পনা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি।
তিনি বলেন, বছরে তিনটি মৌসুমে কৃষিকাজ চলে। প্রতিটি মৌসুমের ঝুঁকি আলাদা। তাই পরিকল্পিত চাষাবাদ ছাড়া ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় অঞ্চলে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো লবণাক্ততা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সমস্যা আরও বিস্তৃত হচ্ছে, যা ফসল উৎপাদনে বড় ধরনের বাধা তৈরি করছে। মৃত্তিকা গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের একটি বড় অংশ লবণাক্ততায় আক্রান্ত, যা কৃষি উৎপাদন সক্ষমতাকে হ্রাস করছে।
এরপরও আশার কথা হলো, নতুন জাতের ফসল ও প্রযুক্তির মাধ্যমে কিছু এলাকায় সফলতা দেখা যাচ্ছে। খুলনার কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশীতে লবণাক্ত জমিতে ব্রি-১০২ ধানের সফল চাষ কৃষকদের নতুন সম্ভাবনার পথ দেখিয়েছে। স্থানীয় কৃষকরা জানান, আগে তারা ভাবতেই পারেননি এই জমিতে ধান চাষ সম্ভব হবে, কিন্তু এখন বাস্তবেই সবুজ ধানের ক্ষেত তাদের স্বপ্নকে বাস্তব করছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, উপকূলীয় কৃষি এখন আর শুধুই ঐতিহ্যগত পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল নয়। আধুনিক গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তির ব্যবহার কৃষকদের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। ফলে প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও উৎপাদন ধরে রাখার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
তবে বাস্তবতা হলো, আবহাওয়ার অনিয়ম ও চরম পরিবর্তন কৃষকের জন্য নিয়মিত চাপ তৈরি করছে। খুলনায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাপমাত্রার ওঠানামা এবং অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত কৃষিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। একদিকে খরিপ মৌসুমের স্বল্প সময়, অন্যদিকে টানা বর্ষা বা অনাবৃষ্টি—সব মিলিয়ে কৃষি ব্যবস্থাপনা জটিল হয়ে উঠছে।
২০২৫ সালের বৃষ্টিপাতের পরিসংখ্যানেও দেখা যায়, একাধিক মাসে অতিরিক্ত বৃষ্টি এবং দীর্ঘস্থায়ী আর্দ্রতা কৃষি উৎপাদনে প্রভাব ফেলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের পরিবর্তন ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে, যদি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়।
তবুও উপকূলের কৃষকরা হার মানতে নারাজ। তারা একদিকে যেমন নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করছেন, অন্যদিকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা স্থানীয় জ্ঞানকেও কাজে লাগাচ্ছেন। এই সমন্বয়ই এখন তাদের টিকে থাকার প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় কৃষিকে টেকসই করতে হলে সরকারি সহায়তা, প্রশিক্ষণ, উন্নত বীজ ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় উদ্ভাবনকে স্বীকৃতি ও প্রসার ঘটাতে পারলে এই অঞ্চলের কৃষি আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারবে।
সব মিলিয়ে খুলনার উপকূলীয় কৃষি এখন এক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জলবায়ুর চাপ যেমন বাড়ছে, তেমনি কৃষকদের উদ্ভাবনী শক্তিও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। এই দ্বৈত বাস্তবতার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠছে ভবিষ্যতের উপকূলীয় কৃষির রূপ।