স্মার্ট কৃষি গড়তে সরকারের মহাপরিকল্পনা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৮ বার
স্মার্ট কৃষি মহাপরিকল্পনা বাংলাদেশ

প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের কৃষি খাতকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং টেকসই ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে সরকার ‘স্মার্ট কৃষি’ কার্যক্রম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একগুচ্ছ মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষিপণ্যের বহুমুখীকরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় এই উদ্যোগকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকারের এই পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কৃষকদের সরাসরি সেবা পৌঁছে দেওয়া এবং কৃষিকে আরও লাভজনক ও টেকসই খাতে পরিণত করা।

এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে গত ১৪ এপ্রিল ‘কৃষক কার্ড’ কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়, যার মাধ্যমে দেশের কৃষকদের জন্য এক নতুন ডিজিটাল সেবা ব্যবস্থার সূচনা হয়েছে। এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা ধাপে ধাপে মোট ১০ ধরনের সরকারি সেবা সরাসরি গ্রহণ করতে পারবেন বলে জানানো হয়েছে।

বুধবার (২২ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে টাঙ্গাইল-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. রবিউল আউয়ালের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে বিষয়গুলো তুলে ধরেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখিত বক্তব্যে বলা হয়, বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ হওয়ায় খাদ্য নিরাপত্তা, দারিদ্র্য হ্রাস এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষিজমি হ্রাস এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে কৃষিখাত বর্তমানে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে কৃষিকে টেকসই খাতে রূপান্তরের লক্ষ্যেই স্মার্ট কৃষি কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

এই পরিকল্পনার মাধ্যমে কৃষকদের জন্য ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ বিতরণ, সরকারি ভর্তুকি, প্রণোদনা, স্বল্পমূল্যে কৃষিযন্ত্র সরবরাহ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, কৃষিবিমা সুবিধা, কৃষিপণ্য বিক্রয়ের ন্যায্য বাজার ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল তথ্য সেবা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি কৃষি প্রশিক্ষণ, আবহাওয়া ও বাজার তথ্য এবং ফসলের রোগবালাই প্রতিরোধে প্রযুক্তিনির্ভর পরামর্শ সেবা দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।

সরকারি পরিকল্পনায় আরও বলা হয়, কৃষি উৎপাদন বাড়াতে উন্নত জাতের বীজ ব্যবহার, সুষম সার প্রয়োগ এবং আধুনিক সেচ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে খাল পুনঃখননের মতো বৃহৎ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, যাতে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়িয়ে কৃষিজমির উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি করা যায়।

এছাড়া কৃষি যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে ট্রাক্টর, হারভেস্টার, রিপারসহ আধুনিক যন্ত্রপাতি সহজলভ্য করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে শ্রম নির্ভর কৃষিকে প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিতে রূপান্তর করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

পতিত জমি চাষের আওতায় আনার জন্য ‘ক্রপ জোনিং’ পদ্ধতি চালু করা হয়েছে, যেখানে নির্দিষ্ট এলাকার মাটি ও আবহাওয়ার উপযোগী ফসল নির্ধারণ করা হয়। এর মাধ্যমে জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে চরাঞ্চল ও সিলেট অঞ্চলের অনাবাদি জমি চাষের আওতায় আনার জন্য বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।

কৃষিপণ্যের বহুমুখীকরণেও সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। ধাননির্ভর কৃষি ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে ফল, সবজি, ডাল, তেলবীজ, মসলা এবং ফুল চাষের দিকে কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। এতে কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি দেশের কৃষি অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কৃষকদের জন্য প্রণোদনা ও সহায়তা কার্যক্রমকে আরও স্বচ্ছ করতে ‘কৃষক কার্ড’ ব্যবস্থাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করা হবে। এর মাধ্যমে কৃষি উপকরণ বিতরণ, ভর্তুকি প্রদান এবং ঋণ সুবিধা সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছে যাবে। পাশাপাশি স্বল্প সুদের কৃষিঋণ ও ফসল বীমা ব্যবস্থাও ধাপে ধাপে চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের জন্য বিশেষ সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে কৃষি পুনর্বাসন খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ থেকে লাখো ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক উপকৃত হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।

কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পরিবর্তনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ, মিনি কোল্ড স্টোরেজ এবং গুদাম নির্মাণের মাধ্যমে কৃষিপণ্যের অপচয় কমানো এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার উদ্যোগ চলছে। পাশাপাশি রপ্তানি অঞ্চল এবং ক্রয়কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে কৃষিপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

কৃষি গবেষণা খাতে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে উচ্চ ফলনশীল, রোগ প্রতিরোধী এবং জলবায়ু সহনশীল ফসল উদ্ভাবনে জোর দেওয়া হচ্ছে। এতে ভবিষ্যতের জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় কৃষি আরও সক্ষম হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ‘ক্লাইমেট স্মার্ট কৃষি’ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে খরা, লবণাক্ততা ও বন্যা সহনশীল ফসল চাষ, পানি ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণ, কম সেচ ও কম রাসায়নিক ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব কৃষি গড়ে তোলার উদ্যোগ রয়েছে। পাশাপাশি ডিজিটাল প্রযুক্তি ও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে কৃষকদের মাঠ পর্যায়ে সহায়তা দেওয়া হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মহাপরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের কৃষি খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। কৃষকরা সরাসরি ডিজিটাল সেবার আওতায় আসবেন এবং উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে, যা খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত