প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার হাওরাঞ্চল ও নিম্নভূমিতে টানা চার–পাঁচ দিনের ভারী বৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। মৌসুমের শেষ পর্যায়ে এসে যখন কৃষকেরা স্বপ্ন দেখছিলেন ঘরে তোলার, ঠিক সেই সময়ই বিস্তীর্ণ বোরো ধানখেত পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় পুরো অঞ্চলে নেমে এসেছে হতাশা ও ক্ষতির দীর্ঘ ছায়া।
হাওর এলাকার কৃষকেরা বলছেন, বছরের পর বছর ধরে ঋণ নিয়ে, পরিশ্রম করে তারা যে ধান ফলিয়েছিলেন, তা কাটার আগেই হঠাৎ পানির নিচে চলে গেছে। অনেক কৃষকের কাছে এটি শুধু ফসল হারানোর ঘটনা নয়, বরং পুরো পরিবারের জীবিকা ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তায় পরিণত হয়েছে।
মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার পতনঊষার কেওলার হাওরে গিয়ে দেখা যায়, চারদিকে থৈ থৈ পানি। যেখানে কয়েক দিন আগেও সোনালি ধান দুলছিল বাতাসে, সেখানে এখন শুধু পানির বিস্তীর্ণতা। স্থানীয় কৃষকেরা জানান, প্রায় এক হাজার হেক্টর জমির ধান ইতোমধ্যে পানির নিচে তলিয়ে গেছে। একই সঙ্গে রাজনগর, কুলাউড়া ও সদর উপজেলার নিম্নাঞ্চলেও একই চিত্র দেখা দিয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে মৌলভীবাজারে প্রায় ৬২ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছিল। এর মধ্যে হাওর এলাকায় ছিল ২৭ হাজার ৩৫৫ হেক্টর জমি। কৃষি কর্মকর্তারা জানান, ইতোমধ্যে হাওরের প্রায় ৭৭ শতাংশ ধান কাটা শেষ হলেও বাকি অংশ এখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। অব্যাহত বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে যেকোনো সময় আরও বড় ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
কেওলার হাওরের কৃষক আনোয়ার খান চোখে পানি নিয়ে বলেন, বহু কষ্ট করে ঋণ করে ধান লাগিয়েছিলাম। ভাবছিলাম এবার ভালোভাবে সংসার চলবে। কিন্তু ধান কাটার আগেই সব পানির নিচে চলে গেছে। এখন ঋণ শোধ করব কীভাবে, সেই চিন্তায় রাত কাটে না।
একই এলাকার কৃষক জুনেদ মিয়া জানান, প্রতি একরে প্রায় ২৭ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। সার, বীজ, শ্রম সব মিলিয়ে পুরো পরিবার জড়িয়ে ছিল এই ফসলে। এখন মাঠে গিয়ে শুধু পানি দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে বছরের সব পরিশ্রম এক মুহূর্তে শেষ হয়ে গেল।
হাকালুকি হাওর এলাকার আব্দুস সবুর বলেন, সারাবছর অপেক্ষা করি এই ফসলের জন্য। কিন্তু প্রকৃতির এমন রূপ আগে কখনো দেখিনি। ধান কেটে ঘরে তোলার আগেই সব শেষ হয়ে গেল। এখন সামনে কীভাবে দিন চলবে, সেটাই বড় প্রশ্ন।
শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র জানিয়েছে, গত পাঁচ দিনে এই অঞ্চলে প্রায় ২৯০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়াবিদরা আরও জানিয়েছেন, আগামী কয়েক দিন বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।
মৌলভীবাজার জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, হাওরের ধান প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। আমরা কৃষকদের দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দিয়েছিলাম। কিন্তু আকস্মিক বৃষ্টি ও উজানের ঢলে কিছু এলাকায় দ্রুত পানি ঢুকে পড়ে ক্ষতি হয়েছে। এখন ক্ষতির সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ করা হচ্ছে।
অন্যদিকে হবিগঞ্জ জেলাতেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, একদিনে ১০৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এতে বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ, নবীগঞ্জ ও লাখাই উপজেলার হাওরাঞ্চলে প্রায় ১ হাজার ২০০ হেক্টর পাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, হবিগঞ্জে চলতি মৌসুমে প্রায় ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৪৪ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে মাত্র অর্ধেকের কিছু বেশি ধান কাটা সম্ভব হয়েছে। ফলে অবশিষ্ট জমির ফসল এখন বড় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
ঝড়ো হাওয়ার কারণে শুধু কৃষিই নয়, জনজীবনও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন এলাকায় গাছ উপড়ে বিদ্যুৎ লাইনের ওপর পড়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক এলাকা এখনো অন্ধকারে রয়েছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন শিক্ষার্থীরা, বিশেষ করে এসএসসি পরীক্ষার্থীরা, যাদের পড়াশোনায় বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটছে।
লাখাই উপজেলায় ঝড়ের সময় গাছ পড়ে বসতবাড়ির ওপর আঘাত হানলে চারজন আহত হন। এছাড়া চুনারুঘাট উপজেলার দৌলতখা আবাদ গ্রামের হাওরে বজ্রাঘাতে মোবিন মিয়া নামে এক তরুণের মৃত্যু হয়েছে, যা পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
হবিগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক কৃষিবিদ দ্বীপক কুমার পাল বলেন, প্রায় ২ হাজার ৭১০ হেক্টর জমির ধান ইতোমধ্যে পানির নিচে চলে গেছে। পরিস্থিতি খুব দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে এবং বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
হাওরাঞ্চলের কৃষকদের এই সংকট এখন শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি তাদের মানসিক ও সামাজিক জীবনেও গভীর প্রভাব ফেলছে। অনেক কৃষকই এখন ঋণের বোঝা, সংসার চালানো এবং আগামী মৌসুমে কীভাবে চাষ করবেন তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও অপ্রত্যাশিত আবহাওয়ার কারণে হাওরাঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থায় নতুন করে পরিকল্পনা প্রয়োজন। নতুবা প্রতি বছর এমন ক্ষতির পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।
সব মিলিয়ে, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের হাওরাঞ্চল আজ এক ভয়াবহ কৃষি সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে কৃষকের কান্না আর প্রকৃতির নিষ্ঠুরতা মিলেমিশে এক দুঃসহ বাস্তবতা তৈরি করেছে।