গুলিস্তানে চাঁদাবাজির দাপট, কোটি টাকার সিন্ডিকেট

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০২৬
  • ৬ বার
গুলিস্তানে চাঁদাবাজির দাপট, কোটি টাকার সিন্ডিকেট

প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানী ঢাকা-র ব্যস্ততম এলাকা গুলিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত জনসমাগম, বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড এবং পরিবহন কেন্দ্র হিসেবে। কিন্তু এই পরিচয়ের আড়ালে গড়ে উঠেছে আরেকটি অদৃশ্য বাস্তবতা—ফুটপাতজুড়ে বিস্তৃত চাঁদাবাজির এক সুসংগঠিত সিন্ডিকেট, যার দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা বলে অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, গুলিস্তানের ফুটপাত, সড়কের একাংশ এবং আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো কার্যত নিয়ন্ত্রণ করছে একটি শক্তিশালী চক্র। রাজনৈতিক পালাবদল হলেও এই কাঠামোর দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরং পুরনো লাইনম্যানরা নতুন পরিচয়ে আবারও সক্রিয় হয়ে পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এলাকার জিরো পয়েন্ট থেকে শুরু করে জিপিও, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ, গোলাপশাহ মাজারসহ বিস্তৃত অঞ্চলে নতুন করে কোনো হকার বসতে চাইলে তাকে প্রথমেই দিতে হয় ‘পজিশন ফি’ নামে মোটা অঙ্কের অর্থ। এলাকাভেদে এই অর্থের পরিমাণ দুই লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত। এই টাকা পরিশোধ না করলে ফুটপাতে ব্যবসা তো দূরের কথা, সেখানে দাঁড়ানোর সুযোগও মেলে না বলে জানিয়েছেন অনেক হকার।

একজন হকার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এই এলাকায় টিকে থাকতে হলে প্রতিটি ধাপে টাকা দিতে হয়। শুধু জায়গা নেওয়ার জন্য এককালীন অর্থ নয়, প্রতিদিনের আয়ের ওপরও নির্ভর করে নিয়মিত চাঁদা দিতে হয়। দোকানের আকার, অবস্থান এবং ক্রেতার চাপ অনুযায়ী প্রতিদিন ৫০ টাকা থেকে শুরু করে এক হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়।

এর বাইরে রয়েছে মাসিক ‘বিট ভাড়া’, যা প্রতিটি নির্দিষ্ট এলাকার জন্য আলাদাভাবে নির্ধারিত। অনেক ক্ষেত্রে হকারদের প্রতি মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। আবার ঈদ বা অন্যান্য উৎসবের সময় অতিরিক্ত নজরানা দিতে বাধ্য করা হয়। ফলে দিনশেষে হকারদের আয়ের একটি বড় অংশ চলে যায় এই চাঁদাবাজ চক্রের হাতে।

স্থানীয়দের মতে, পুরো গুলিস্তান এলাকাটি ভাগ করা হয়েছে বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণ অঞ্চলে, যেখানে প্রতিটি অংশের দায়িত্বে রয়েছেন নির্দিষ্ট লাইনম্যান। এদের মধ্যে নবী, বাবুল, হারুন, সালেহসহ অন্তত ২০ জনের নাম ঘুরেফিরে আসছে। তারা প্রত্যেকে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় প্রতিদিন বিকেলে অবস্থান নেন এবং তাদের নিযুক্ত লোকজন হকারদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে তাদের কাছে জমা দেন।

চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে বা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা না দিলে হকারদের উচ্ছেদ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে শারীরিক নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে। ফলে ভয়ের মধ্যেই ব্যবসা চালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন হাজারো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।

এই সিন্ডিকেটের পেছনে রয়েছে বিভিন্ন নামে পরিচালিত হকার্স সংগঠন, যেগুলোর অনেকই নিবন্ধনবিহীন। এসব সংগঠনের ছত্রছায়ায় থেকেই মূলত চাঁদাবাজির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যদিও সংগঠনগুলোর নেতারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে।

এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। সংস্থা দুটি ফুটপাত ও খালি জায়গাগুলোতে হকারদের পুনর্বাসনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে হকারদের আইডি কার্ড প্রদান এবং নির্দিষ্ট স্থানে বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গত মাসের শুরুতে গুলিস্তান ও আশপাশের এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। বায়তুল মোকাররম দক্ষিণ গেটসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে হকারদের সরিয়ে দেওয়া হয়। তবে কয়েক দিনের মধ্যেই আবারও সেই পুরনো চিত্র ফিরে আসে, যা প্রশাসনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এর পেছনে যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা রয়েছে, তা বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। হকারদের একটি বড় অংশ জীবিকার তাগিদেই এই পেশায় যুক্ত। তাদের বিকল্প ব্যবস্থা না করে উচ্ছেদ করলে সমস্যা অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।

বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের সভাপতি এম এ কাশেম মনে করেন, এই সমস্যার মূল কারণ লাইনম্যানভিত্তিক চাঁদাবাজি। তার মতে, প্রথমে এই চক্রকে ভেঙে দিতে হবে এবং পরে হকারদের একটি তালিকার আওতায় এনে নির্দিষ্ট স্থানে পুনর্বাসন করতে হবে। এতে করে একদিকে যেমন শৃঙ্খলা ফিরবে, অন্যদিকে চাঁদাবাজির সুযোগও কমে আসবে।

অন্যদিকে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম জানিয়েছেন, বৈধভাবে নিবন্ধিত হকারদের আইডি কার্ড দেওয়া হবে এবং তাদের কাছ থেকে কেউ চাঁদা চাইতে পারবে না। তবে এই নীতির বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

গুলিস্তানের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকায় এমন চাঁদাবাজির চক্র শুধু আইনশৃঙ্খলার জন্যই নয়, বরং নগর ব্যবস্থাপনার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন লাখো মানুষের চলাচলের এই এলাকায় যদি নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে এর প্রভাব পুরো নগরজীবনের ওপর পড়বে।

সব মিলিয়ে, গুলিস্তানের ফুটপাত এখন শুধু ব্যবসার জায়গা নয়, বরং একটি নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠেছে, যেখানে বৈধতার চেয়ে শক্তি ও প্রভাবই বড় ভূমিকা পালন করছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক সদিচ্ছা। অন্যথায় কোটি টাকার এই চাঁদাবাজির চক্র ভাঙা কঠিন হয়ে পড়বে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত