কাওয়াদিঘি হাওরে ডুবে যাচ্ছে বোরো ধান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৪ মে, ২০২৬
  • ৫৫ বার
কাওয়াদিঘি হাওরে কৃষকের আহাজারি

প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মৌলভীবাজারের কাওয়াদিঘি হাওরে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ায় বোরো ধান চাষে ভয়াবহ ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে মনু নদী সেচ প্রকল্পভুক্ত এই বিস্তীর্ণ হাওর এখন জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, হাওরের অর্ধেকের বেশি বোরো ধান ইতিমধ্যে পানির নিচে তলিয়ে গেছে, আর দ্রুত পানি না সরালে পুরো ফসলই নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

সরেজমিনে কাশেমপুর পাম্প হাউস এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, চারদিকে থই থই পানি। কাদা মিশ্রিত পানির নিচে কোথাও কোথাও শুধু ধানের শীষের সামান্য অংশ উঁকি দিচ্ছে। স্থানীয় কৃষকরা জানান, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে নতুন করে বহু জমি তলিয়ে গেছে, যেখানে এখন আর ধান কাটার কোনো সুযোগই নেই।

কাওয়াদিঘি হাওরের কৃষক আনসার মিয়া ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলেন, কয়েক দিন আগেও কিছু জমি রক্ষা করা সম্ভব ছিল, কিন্তু এখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। তার ভাষায়, “পানি এভাবে বাড়তে থাকলে শুধু ধান নয়, শুকানোর খলাও ডুবে যাবে। আমরা চরম বিপদের মধ্যে আছি, কিন্তু পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই।”

একই এলাকার কৃষক আব্দুল খালিক জানান, কাশেমপুর পাম্প হাউসের পানি নিষ্কাশন ক্ষমতা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। ফলে পানি নামতে না পারায় হাওরের অন্তত ৫ থেকে ৭টি গ্রামের কৃষকরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। তিনি বলেন, শুধু পানি নয়, শ্রমিক সংকট ও শ্রমমূল্যের উচ্চতার কারণে তলিয়ে যাওয়া ধান কাটাও সম্ভব হচ্ছে না।

স্থানীয় কৃষকদের মতে, হাওরের বর্তমান পরিস্থিতি গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ। অনেকে আশঙ্কা করছেন, শেষ মুহূর্তে দ্রুত পানি না নামলে মৌলভীবাজারের এই গুরুত্বপূর্ণ ধানভান্ডার মারাত্মক খাদ্য সংকট ও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মৌলভীবাজার জেলায় এ বছর মোট ৬২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে। এর মধ্যে কাওয়াদিঘি হাওরেই চাষ হয়েছে প্রায় ২৩ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে। সরকারি হিসেবে এখন পর্যন্ত অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ২ হাজার ৩৪৯ হেক্টর জমি পানির নিচে চলে গেছে বলে জানানো হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের কৃষকদের দাবি, ক্ষতির পরিমাণ এর চেয়ে অনেক বেশি।

কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হাওরের প্রায় ৮২ শতাংশ ধান ইতিমধ্যে কাটা শেষ হয়েছে। কিন্তু স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। তাদের দাবি, এখনো অর্ধেকের বেশি ধান মাঠে রয়ে গেছে, যার বড় অংশই পানিতে তলিয়ে আছে।

এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, কাশেমপুর পাম্প হাউস থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে পানি নিষ্কাশনের কাজ চলছে। তবে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে যে পরিমাণ পানি প্রবেশ করছে, তার তুলনায় নিষ্কাশনের সক্ষমতা কম হওয়ায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। পাউবোর কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে পানির চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন অলীদ বলেন, পাম্প হাউসের ক্ষমতা অনুযায়ী সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে পানি নিষ্কাশনের জন্য। কিন্তু বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এত বেশি যে পানি কমার গতি খুব ধীর। ফলে হাওরে জলাবদ্ধতা দীর্ঘায়িত হচ্ছে।

হাওরপাড়ের সাধারণ মানুষ এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। প্রায় ১০ দিন ধরে জলাবদ্ধতার কারণে কৃষিকাজ থেমে গেছে। অনেক পরিবার তাদের বছরের প্রধান আয়ের উৎস বোরো ধান হারানোর শঙ্কায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে। কেউ কেউ কিস্তি ও ঋণের চাপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কাওয়াদিঘি হাওরের বর্তমান সংকট শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং দীর্ঘদিনের পানি ব্যবস্থাপনা দুর্বলতার ফল। পাম্প হাউসের সক্ষমতা বৃদ্ধি, খাল-নালা সংস্কার এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ছাড়া এই ধরনের সংকট ভবিষ্যতেও বারবার দেখা দিতে পারে।

স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং কৃষকদের ক্ষতি কমাতে প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়েও আলোচনা চলছে। তবে কৃষকদের দাবি, এখনই জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে চলতি মৌসুমের ফসল সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে যাবে।

সব মিলিয়ে কাওয়াদিঘি হাওরের বর্তমান পরিস্থিতি কৃষক জীবনে এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ধান হারানোর শঙ্কায় দিন কাটানো এই কৃষকদের চোখে এখন শুধু একটাই প্রশ্ন—এই বিপর্যয়ের শেষ কোথায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত