প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর চলমান ঋণ কর্মসূচির মধ্যেই বাংলাদেশ নতুন করে প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার ঋণ চাওয়ার আলোচনা শুরু করেছে, যা দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও সাধারণ মানুষের জীবনে সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। একই সময়ে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকেও এক বিলিয়ন ডলার সহায়তা চাওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিকভাবে এই ঋণ প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। বৈঠকে ইতিবাচক সাড়া মিলেছে বলেও কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।
সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এ ধরনের আলোচনা সাধারণত গোপন পর্যায়ে থাকে এবং দুই পক্ষের মধ্যে পূর্ণ সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয় না।
এই আলোচনা এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন ২০২৩ সালে আইএমএফের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চলমান ঋণ কর্মসূচির ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ ছাড় আটকে আছে। এমনকি নির্ধারিত সময় অনুযায়ী চলতি বছরের জুনে ১৩০ কোটি ডলার ছাড় হওয়ার কথা থাকলেও সেটি এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নতুন করে ঋণ চাওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমানোর একটি কৌশল হতে পারে। বিশেষ করে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সরকার চাপের মধ্যে রয়েছে।
ঢাকার একজন অর্থনীতিবিদ জানান, আইএমএফ সাধারণত ঋণ দেওয়ার আগে কঠোর শর্ত আরোপ করে। এসব শর্তের মধ্যে থাকে ভর্তুকি কমানো, কর কাঠামো সংস্কার, রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং ব্যাংক খাতে কাঠামোগত পরিবর্তন। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করলে সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর।
তার মতে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, বিদ্যুতের সম্ভাব্য মূল্য সমন্বয় এবং কর কাঠামোর পরিবর্তন মিলিয়ে জনজীবনে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে নতুন ঋণ প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানি ব্যয় সামাল দিতে এবং রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের আরেকটি অংশ মনে করেন, সরকার চলমান ঋণ কর্মসূচির কিস্তি পাওয়ার চেয়ে নতুন একটি কাঠামোর অধীনে অর্থায়ন পাওয়ার দিকে বেশি আগ্রহী হতে পারে। তবে এতে পুরনো শর্তগুলো আবারও নতুনভাবে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইএমএফের শর্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশেষ করে ব্যাংক খাত সংস্কার, করছাড় কমানো এবং ভর্তুকি প্রত্যাহারের মতো সিদ্ধান্ত জনঅসন্তোষ তৈরি করতে পারে।
অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, চলমান কর্মসূচিতে যে সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করার কথা ছিল, তার অনেকগুলোই এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। ফলে আইএমএফ নতুন করে আলোচনায় গেলে পুরনো শর্তগুলোই আবার গুরুত্ব পাবে। এতে জনগণের ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
অন্যদিকে সিপিডির একজন গবেষক মনে করেন, বৈশ্বিক সংকটের কারণে সরকারকে অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হচ্ছে, যা সামাল দিতে নতুন ঋণ ছাড়া বিকল্প সীমিত। তবে এই ঋণ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, ইরান-সংক্রান্ত উত্তেজনার কারণে জ্বালানি আমদানি ব্যয় প্রায় তিন বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই অতিরিক্ত ব্যয় রিজার্ভ থেকে মেটানো হলে বৈদেশিক বাণিজ্য ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছ থেকে নতুন ঋণ নেওয়ার চিন্তা সামনে এসেছে। তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, ঋণ নির্ভরতা বাড়লে ভবিষ্যতে সুদ ও পরিশোধের চাপও বাড়বে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন ঋণ পাওয়া গেলেও তার শর্ত অনুযায়ী রাজস্ব আয় বাড়াতে কর বাড়ানো হতে পারে, যা সাধারণ মানুষের ব্যয় আরও বাড়াবে। পাশাপাশি ভর্তুকি কমানো হলে জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দামেও প্রভাব পড়বে।
সব মিলিয়ে নতুন ঋণ কর্মসূচি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে স্বস্তি দিলেও তা সাধারণ মানুষের জীবনে বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। এখন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা এবং একই সঙ্গে জনজীবনের ওপর অতিরিক্ত চাপ না বাড়ানো।