প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশে আবারও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি এবং ভর্তুকির চাপ সামাল দিতে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সর্বোচ্চ ইউনিটপ্রতি ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে পাঠানো হয়েছে। এখন কমিশনের পর্যালোচনা ও গণশুনানির পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে। যদি সব প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন হয়, তবে আগামী জুন মাস থেকেই নতুন দর কার্যকর হতে পারে।
দেশের বিদ্যুৎ খাত বর্তমানে বড় ধরনের আর্থিক চাপে রয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), কয়লা ও তেলের বড় একটি অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। গত কয়েক বছরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্বাভাবিক পরিস্থিতির কারণে এসব জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ে।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে খরচ হচ্ছে, গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করা মূল্যের তুলনায় তা গড়ে প্রায় ৫ টাকা ৫০ পয়সা বেশি। ফলে বিশাল অঙ্কের ভর্তুকি দিয়ে সরকারকে বিদ্যুৎ খাত সচল রাখতে হচ্ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সম্ভাব্য ঘাটতি প্রায় ৫৬ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্য অব্যাহত থাকলে এই ঘাটতি আরও বাড়তে পারে।
সরকার ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৩৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ভর্তুকির বাড়তি চাপ জাতীয় বাজেট ব্যবস্থাপনাকে জটিল করে তুলছে। এ অবস্থায় বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের মাধ্যমে কিছুটা আর্থিক ভারসাম্য ফেরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধুমাত্র জ্বালানির দাম নয়, বিদ্যুৎ খাতের আরেকটি বড় ব্যয় হলো ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’। দেশে এমন অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, যেগুলো পুরো সক্ষমতায় উৎপাদন না করলেও চুক্তি অনুযায়ী তাদের নির্দিষ্ট অর্থ পরিশোধ করতে হয়। এই ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝাও পিডিবির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই ব্যয় কমানো না গেলে শুধু দাম বাড়িয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে না।
বিদ্যুৎ বিভাগের পাঠানো প্রস্তাবে পাইকারি পর্যায়ে ইউনিটপ্রতি সর্বোচ্চ ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। খুচরা পর্যায়ে গ্রাহকদের ব্যবহারের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন হারে মূল্য সমন্বয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে স্বল্প ব্যবহারকারী বা লাইফলাইন গ্রাহকদের আপাতত বাড়তি চাপের বাইরে রাখার চিন্তা করছে সরকার। সাধারণত যারা মাসে ৭০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা রাখার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, নিয়ম অনুযায়ী প্রস্তাব পাওয়ার পর আইন মেনে তা যাচাই-বাছাই করা হবে। এরপর গণশুনানির মাধ্যমে ভোক্তা, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের মতামত নেওয়া হবে। সব দিক বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হবে।
অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে তা সাময়িকভাবে সরকারের ভর্তুকির চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে এর প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর পড়বে। শিল্প খাতেও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে ভোক্তাদের ওপর চাপ তৈরি করবে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ক্ষুদ্র শিল্প ও উৎপাদন খাতের উদ্যোক্তারা ইতোমধ্যেই বাড়তি গ্যাস ও জ্বালানি ব্যয়ের কারণে চাপে রয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ আরও বেড়ে যাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
অন্যদিকে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। গত কয়েক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, পরিবহন ব্যয় ও বাসাভাড়া বৃদ্ধির কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এমনিতেই চাপে রয়েছে। তার ওপর বিদ্যুতের বিল বাড়লে মাসিক ব্যয়ের হিসাব আরও কঠিন হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন অনেকে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতের ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার জরুরি। তারা বলছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো, অপচয় কমানো, অকার্যকর বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনর্বিবেচনা এবং স্বচ্ছ ক্রয়নীতি অনুসরণ না করলে বারবার মূল্যবৃদ্ধি করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।
বাংলাদেশে সর্বশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিদ্যুতের খুচরা মূল্য গড়ে ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল। তখনও সরকার বলেছিল, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। এক বছরের কিছু বেশি সময়ের ব্যবধানে আবারও নতুন মূল্যবৃদ্ধির আলোচনা শুরু হওয়ায় জনমনে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং আর্থিক ভারসাম্য বজায় রাখতে কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। তারা আশা করছেন, মূল্য সমন্বয়ের মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপ কিছুটা হলেও কমবে এবং ভবিষ্যতে সেবার মান ধরে রাখা সহজ হবে।
তবে শেষ পর্যন্ত কতটা দাম বাড়বে এবং কোন শ্রেণির গ্রাহক কতটা প্রভাবিত হবেন, সেটি নির্ভর করবে বিইআরসির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর। এখন দেশের কোটি কোটি গ্রাহকের চোখ সেই সিদ্ধান্তের দিকেই।