পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ভূমিধ্বস জয়ের পর মুখ্যমন্ত্রী কে?

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০২৬
  • ৪ বার
ভূমিধ্বস জয় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কাকে বেছে নেবে বিজেপি?

প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক মোড়ের আভাস মিলছে এবারের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্যের পর বড় ধাক্কা খেতে যাচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি)। নির্বাচনের ফলাফলে স্পষ্ট হয়েছে, ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) প্রথমবারের মতো রাজ্যটিতে সরকার গঠনের পথে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে। ২৯৩টি আসনের মধ্যে ২০৬টিতে জয় বা এগিয়ে থেকে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সমীকরণই বদলে দিয়েছে। এই ফলাফল সামনে আসার পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—রাজ্যের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী কে হচ্ছেন?

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দলীয় সূত্রের মতে, মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। এবারের নির্বাচনে তিনি শুধু জয়ই পাননি, বরং রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তার নিজ কেন্দ্র ভবানীপুরে পরাজিত করে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছেন। এর আগে ২০২১ সালের নির্বাচনে নন্দীগ্রামে মমতাকে হারিয়ে জাতীয় রাজনীতিতেও আলোচনায় উঠে এসেছিলেন শুভেন্দু। ফলে টানা দুই নির্বাচনে মমতার বিরুদ্ধে জয়ের রেকর্ড তাকে বিজেপির অন্যতম শক্তিশালী মুখে পরিণত করেছে।

নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর কলকাতা থেকে দিল্লি পর্যন্ত রাজনৈতিক মহলে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব এখন এমন একজনকে মুখ্যমন্ত্রী করতে চায়, যিনি শুধু দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারবেন না, বরং পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বাস্তবতায় দীর্ঘমেয়াদে দলের অবস্থানও শক্তিশালী করবেন। সেই জায়গা থেকে শুভেন্দু অধিকারীকে অনেকটাই এগিয়ে রাখা হচ্ছে। কারণ, একসময় তৃণমূল কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ নেতা থাকা এই রাজনীতিক রাজ্যের গ্রামীণ ও শহুরে দুই পর্যায়েই শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।

ভবানীপুরের ফলাফল এবার সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে। এই কেন্দ্রটি দীর্ঘদিন ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল। সেই আসনেই প্রায় ১৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে শুভেন্দুর জয়কে বিজেপি ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে দেখছে। নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনি ধারাবাহিকভাবে হিন্দুত্ব, উন্নয়ন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পকে সামনে এনে ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই কৌশল রাজ্যের একাংশের ভোটব্যাংকে বড় প্রভাব ফেলেছে।

তবে মুখ্যমন্ত্রীর দৌড়ে শুধু শুভেন্দু অধিকারীর নামই নয়, আলোচনায় রয়েছে আরও কয়েকজন। বিজেপির নারী নেতৃত্বের অন্যতম পরিচিত মুখ অগ্নিমিত্রা পালও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে উঠে এসেছেন। আসানসোল দক্ষিণ আসনে জয় পাওয়া এই নেত্রীকে নিয়ে দলের ভেতরে ইতিবাচক আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে নারী ভোটারদের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা এবং সাংগঠনিক সক্রিয়তা তাকে সম্ভাব্য মুখ্যমন্ত্রী প্রার্থীর তালিকায় জায়গা করে দিয়েছে। বিজেপি যদি পশ্চিমবঙ্গে নারী মুখ্যমন্ত্রী দেওয়ার কৌশল নেয়, তাহলে অগ্নিমিত্রা পালের নাম গুরুত্ব পেতে পারে।

এছাড়া বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের নামও আলোচনায় রয়েছে। দলীয় নেতারা বলছেন, রাজ্যে বিজেপির এই বড় সাফল্যের পেছনে তার সাংগঠনিক দক্ষতা এবং দীর্ঘদিনের প্রস্তুতির ভূমিকা রয়েছে। ফলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তাকে পুরস্কৃত করতে চাইলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে শুভেন্দু অধিকারীর জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক গুরুত্ব অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি।

শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক যাত্রাও বেশ নাটকীয়। একসময় তিনি ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং রাজ্য মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। কিন্তু ২০২০ সালের ডিসেম্বরে নাটকীয়ভাবে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন তিনি। সেই সময় তাকে দলে স্বাগত জানিয়েছিলেন ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। এরপর থেকেই বিজেপি তাকে পশ্চিমবঙ্গে দলের সবচেয়ে বড় মুখ হিসেবে তুলে ধরতে শুরু করে। এবারের নির্বাচনে ভবানীপুরে মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময়ও অমিত শাহ তার পাশে ছিলেন। রাজনৈতিক মহলের মতে, এটিই ছিল কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আস্থার স্পষ্ট বার্তা।

নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর শুভেন্দু অধিকারী সাংবাদিকদের বলেন, এই জয় শুধু বিজেপির নয়, এটি বাংলার মানুষের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। তিনি দাবি করেন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক হতাশা, দুর্নীতির অভিযোগ এবং প্রশাসনিক অস্থিরতার বিরুদ্ধে মানুষ ভোট দিয়েছে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্ব এবং কেন্দ্রীয় সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমও এই জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অন্যদিকে, টিএমসির জন্য এই ফলাফল বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এক দশকের বেশি সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রাখা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। বিশেষ করে তার নিজ কেন্দ্র ভবানীপুরে পরাজয় দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে। যদিও তৃণমূল নেতারা বলছেন, তারা ফলাফল পর্যালোচনা করে পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মসূচি নির্ধারণ করবেন।

এদিকে বিজেপি শিবিরে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। কলকাতাসহ বিভিন্ন জেলায় দলীয় নেতাকর্মীরা বিজয় মিছিল করছেন। তবে সরকার গঠন ও মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচন নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসেনি। খুব শিগগিরই কলকাতায় নবনির্বাচিত বিধায়কদের নিয়ে বৈঠক করবে বিজেপি। সেই বৈঠকের পরই মুখ্যমন্ত্রীর নাম চূড়ান্ত হতে পারে বলে জানা গেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এই উত্থান শুধু একটি রাজ্যের ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং ভারতের জাতীয় রাজনীতিতেও বড় বার্তা বহন করছে। দীর্ঘদিন ধরে বিজেপির জন্য কঠিন রাজনৈতিক জমি হিসেবে পরিচিত পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করতে পারলে তা দলটির জন্য কৌশলগতভাবে বড় সাফল্য হবে। আর সেই সরকারের নেতৃত্বে কে থাকবেন, সেটিই এখন রাজ্য রাজনীতির সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত