প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের উত্তরাঞ্চলে সংক্রামক রোগ হাম নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল-এ হাম উপসর্গ নিয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। মৃত শিশুটির বাড়ি মধুপুর উপজেলা-এ। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে এ ঘটনায় স্থানীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান জানিয়েছেন, ৩০ এপ্রিল শিশুটি জ্বর, র্যাশ এবং শ্বাসকষ্টসহ হামজাতীয় উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় অবস্থার অবনতি হলে পরে তার মৃত্যু হয়। চিকিৎসকরা জানান, শিশুটিকে সর্বোচ্চ চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, তবে রোগের জটিলতা অনেক বেশি ছিল।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ১৯ জন শিশু হাম উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় আইসোলেশন ওয়ার্ডে চাপ বাড়ছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৭ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৮৮ জন শিশু হাম উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে ২৫ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। একই সময়ে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ৯৮৪ জন শিশু।
সংক্রমণ পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আলাদা আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করেছে। সেখানে আক্রান্ত শিশুদের আলাদা করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে যাতে রোগটি অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে না পড়ে। চিকিৎসকরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে, যাদের টিকাদান সম্পূর্ণ হয়নি বা দুর্বল ইমিউন সিস্টেম রয়েছে।
চিকিৎসকরা অভিভাবকদের প্রতি সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলছেন, জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে ফুসকুড়ির মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসা উচিত। দেরি হলে রোগটি জটিল আকার ধারণ করতে পারে, যা প্রাণঘাতীও হতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, টিকাদান কর্মসূচি আরও জোরদার করা প্রয়োজন। অনেক এলাকায় এখনো নিয়মিত টিকাদান কাভারেজ সম্পূর্ণ হয়নি, যা হাম সংক্রমণ বৃদ্ধির একটি বড় কারণ হতে পারে। তারা বলেন, শুধু চিকিৎসা নয়, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার না করলে এ ধরনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
স্থানীয়ভাবে অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই শিশুদের নিয়ে হাসপাতালে ছুটছেন, আবার কেউ কেউ আগাম সতর্কতা হিসেবে টিকা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, আতঙ্ক নয়, সচেতনতা এবং সময়মতো চিকিৎসাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত চিকিৎসক ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সচেতনতামূলক কার্যক্রমও জোরদার করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এ ধরনের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে শুধু হাসপাতালভিত্তিক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা, সময়মতো টিকা গ্রহণ এবং দ্রুত শনাক্তকরণ ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে গ্রামীণ ও নিম্নআয়ের এলাকায় নজরদারি আরও বাড়াতে হবে।
সব মিলিয়ে, ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে হাম উপসর্গে শিশুর মৃত্যুর ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি বৃহত্তর জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা।