দেড় বছরে সরকারের ঋণ বেড়েছে ৩ লাখ কোটি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০২৬
  • ৭ বার
দেড় বছরে সরকারের ঋণ বেড়েছে ৩ লাখ কোটি

প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেড় বছরের ব্যবধানে দেশের সরকারি ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়তে থাকায় অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ ঋণ বুলেটিন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে সরকারের মোট ঋণ বেড়েছে প্রায় ৩ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা। এই সময়ে দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে বড় পরিবর্তনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকলেও ঋণের এই ঊর্ধ্বগতি থামানো যায়নি বলে দেখা যাচ্ছে।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারের মোট দেশি ও বিদেশি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ৬ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। মাত্র ছয় মাস আগেও এই পরিমাণ ছিল ২১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে ঋণ আরও বেড়ে গেছে, যা অর্থনীতির কাঠামোগত চাপকে আরও স্পষ্ট করছে।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল ১৯ লাখ ৪৪ হাজার ১৭১ কোটি টাকা। সেই তুলনায় এক বছরের ব্যবধানে ঋণ বেড়েছে প্রায় ২ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রবণতা শুধু ব্যয় বৃদ্ধির ফল নয়, বরং রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা এবং আগের ঋণের চাপ সামলানোর নীতিগত সীমাবদ্ধতারও প্রতিফলন।

বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বড় মেগা প্রকল্পগুলো থেকে সরে আসা এবং উন্নয়ন ব্যয় কিছুটা কমলেও অর্থনীতির মূল চাপ কমেনি। বরং পরিচালন ব্যয় ও ঋণ পরিশোধের খরচ বাড়তে থাকায় সরকারের ঋণনির্ভরতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় না হওয়ায় বাজেট ঘাটতি পূরণে ধার নেওয়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকে।

ঋণের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের সময় দেশের মোট ঋণ ছিল প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা। সময়ের ব্যবধানে ২০২৪ সালের জুনে তা দাঁড়ায় প্রায় ১৮ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকায়। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিভিন্ন হিসাব পুনর্মূল্যায়ন ও বৈদেশিক ঋণ রূপান্তরের কারণে এই পরিমাণে ওঠানামা দেখা যায়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বৈদেশিক ঋণ বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি। এই সময়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা থেকে বাজেট সহায়তা এসেছে, যা বৈদেশিক ঋণের পরিমাণকে আরও বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে ডলারের বিনিময় হার পরিবর্তনের কারণে বৈদেশিক ঋণের টাকার অঙ্কেও বড় পরিবর্তন এসেছে।

অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ ঋণও কমেনি। আগের সরকারের পতনের আগে যেখানে অভ্যন্তরীণ ঋণ ছিল প্রায় ১০ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা, তা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ধার নেওয়ার প্রবণতা কমছে না, যা বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে।

অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, উন্নয়ন ব্যয় কমলেও ঋণ বাড়ার প্রধান কারণ হচ্ছে সুদ ও মূলধন পরিশোধের চাপ। সরকারের আয়ের বড় অংশ এখন ঋণের সুদ পরিশোধেই ব্যয় হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে শুধু সুদ পরিশোধেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬৬ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ব্যয়ের একটি বড় অংশ।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে রাজস্ব আয় দিয়ে শুধুমাত্র পরিচালন ব্যয় মেটানোই কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে নতুন ঋণ নিয়ে পুরোনো ঋণ পরিশোধের প্রবণতা বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এ বিষয়ে সাবেক অর্থসচিবরা মনে করেন, উন্নয়ন ব্যয় কমলেও যদি রাজস্ব কাঠামো শক্তিশালী না করা যায়, তবে ঋণনির্ভরতা কমানো সম্ভব নয়। তারা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি নব্বইয়ের দশকের পর সবচেয়ে চাপযুক্ত আর্থিক কাঠামোর ইঙ্গিত দিচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, গত অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন তুলনামূলকভাবে কম ছিল, যা সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। অথচ একই সময়ে ঋণ বৃদ্ধির হার ছিল উচ্চমাত্রায়। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি একটি অস্বাভাবিক অর্থনৈতিক চিত্র, যেখানে উন্নয়ন ব্যয় কমলেও ঋণ বাড়ছে।

সরকারি সূত্রগুলো বলছে, বৈদেশিক উন্নয়ন সহায়তা ও ঋণ গ্রহণ অব্যাহত থাকায় প্রকল্প বাস্তবায়ন কিছুটা গতিশীল রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে প্রকৃত রাজস্ব আয় প্রত্যাশা অনুযায়ী না হওয়ায় বাজেট ঘাটতি পূরণে ধার নেওয়ার ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।

অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বাড়বে এবং বাজেটের বড় অংশ সুদ পরিশোধে চলে যাবে, যা উন্নয়ন ব্যয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে সরকারপক্ষের ব্যাখ্যায় বলা হচ্ছে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, আমদানি ব্যয়, জ্বালানি খরচ এবং পূর্ববর্তী সরকারের দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পগুলোর দায় পরিশোধের কারণেই ঋণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে তারা দাবি করছে, ধীরে ধীরে রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে দেড় বছরে ঋণের এই ঊর্ধ্বগতি দেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজস্ব সংস্কার, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় কঠোর নীতি না নিলে ভবিষ্যতে এই চাপ আরও গভীর হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত