লোকসানে মধ্যপাড়া পাথরখনি, উৎপাদনে অনিশ্চয়তা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০২৬
  • ১৫ বার
লোকসানের মুখে মধ্যপাড়া পাথরখনি

প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের একমাত্র ভূগর্ভস্থ পাথর খনি দিনাজপুরের পার্বতীপুরের মধ্যপাড়া এখন গভীর আর্থিক সংকটে পড়েছে। একসময় লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত এই খনি এখন টানা লোকসানের ভারে ন্যুব্জ। গত দুই অর্থবছরে খনিটি প্রায় ৪৪ কোটি টাকা লোকসান করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং বিক্রয়মূল্যের তুলনায় কম দাম পাওয়াই এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।

মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড (এমজিএমসিএল) পরিচালিত এই খনিতে ১২শ থেকে ১৩শ ফুট গভীর ভূগর্ভ থেকে আধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে পাথর উত্তোলন করা হয়। বিস্ফোরণ ঘটিয়ে কঠিন শিলা ভেঙে বের করা এই পাথর দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু এই জটিল ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়াই এখন খনির অর্থনীতিকে চাপে ফেলছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হলো ডলারের মূল্যবৃদ্ধি এবং পাথর উত্তোলনে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ বিস্ফোরক অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট আমদানির ওপর নতুন করে কর ও ভ্যাট আরোপ। এসব কারণে প্রতি টন পাথর উৎপাদনে খরচ বেড়ে গেছে, অথচ বিক্রয়মূল্য সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে প্রতি টনে গড়ে প্রায় ৫০০ টাকা লোকসানে পাথর বিক্রি করতে হচ্ছে খনিটিকে।

খনির কর্মকর্তারা জানান, ভূগর্ভে পাথর উত্তোলনের জন্য প্রতিদিন কয়েক টন বিস্ফোরক ব্যবহার করতে হয়, যা সম্পূর্ণই আমদানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে এসব কাঁচামালের দাম আরও বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিবহন ও ডলার বিনিময় খরচ, যা উৎপাদন ব্যয়কে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে।

মধ্যপাড়া খনির ইতিহাসে একসময় লাভজনক অধ্যায়ও ছিল। ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে টানা কয়েক বছর খনিটি প্রায় ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত লাভ করেছিল এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বড় অঙ্কের অর্থও জমা দেয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বাজার পরিস্থিতি, বৈদেশিক মুদ্রার অস্থিরতা এবং করনীতির পরিবর্তনে সেই লাভজনক অবস্থান থেকে সরে আসে খনিটি।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে খনিটি ৩৭ কোটি টাকা এবং পরবর্তী অর্থবছরে আরও ৭ কোটি টাকা লোকসানে পড়ে। চলতি অর্থবছরেও একই ধারা অব্যাহত রয়েছে বলে কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।

এদিকে খনির ব্যবস্থাপনা বলছে, উৎপাদন চালু রাখতে সরকারি নীতিগত সহায়তা এখন অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে বিস্ফোরক আমদানিতে কর রেয়াত, ডলারের ওপর চাপ কমানো এবং পাথরের ট্যারিফ মূল্য পুনর্বিবেচনার দাবি জানানো হয়েছে। তাদের মতে, এসব উদ্যোগ নেওয়া গেলে উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং খনিটি আবারও লাভের ধারায় ফিরতে পারবে।

মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী জোবায়েদ হোসেন জানান, দেশের অবকাঠামো খাতে পাথরের চাহিদা বিশাল হলেও মধ্যপাড়ার উৎপাদন সেই তুলনায় অনেক কম। দেশে বছরে প্রায় তিন কোটি টন পাথরের চাহিদা থাকলেও এই খনি থেকে উৎপাদন হয় মাত্র ১৫ থেকে ১৬ লাখ টন, যা মোট চাহিদার মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ। ফলে বাকি অংশ পুরোপুরি আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়।

তিনি আরও জানান, খনির ইয়ার্ডে বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ ৯০ হাজার মেট্রিক টন পাথর মজুত রয়েছে। এর মধ্যে ব্লাস্ট পাথর ও বোল্ডার মিলিয়ে বড় একটি অংশ পড়ে আছে, যা বিক্রি না হলে জায়গা সংকট তৈরি হচ্ছে। বিক্রি কমে গেলে উৎপাদনও ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।

খনির ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯৯৪ সালে এটি উদ্বোধন করা হয় এবং ২০০৭ সাল থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়। শুরুতে প্রযুক্তিগত জটিলতা ও ব্যবস্থাপনার সমস্যায় খনিটি ঠিকমতো চলতে পারেনি। পরবর্তীতে বিদেশি প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা যুক্ত হওয়ার পর উৎপাদন বাড়ে এবং প্রতিষ্ঠানটি লাভের মুখ দেখে। তবে বর্তমানে আবারও সেই স্থিতিশীলতা হারানোর শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মধ্যপাড়া খনি শুধু একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের একটি কৌশলগত সম্পদ। তাই এটিকে টিকিয়ে রাখতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও নীতিগত সহায়তা জরুরি। অন্যথায় দেশের পাথর আমদানির ওপর নির্ভরতা আরও বাড়বে, যা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।

খনির বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের লোকসানের গল্প নয়, বরং দেশের খনিজ সম্পদ ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জকেও সামনে নিয়ে এসেছে। এখন সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে নীতিনির্ধারকদের ওপর—এই গুরুত্বপূর্ণ খনি আবারও ঘুরে দাঁড়াবে, নাকি লোকসানের চাপে ধীরে ধীরে থমকে যাবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত