প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা যখন বাড়ছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, রাজনৈতিক সংকটের কোনো সামরিক সমাধান নেই, আর সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক বার্তায় আরাঘচি স্পষ্টভাবে বলেন, হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে যে বল প্রয়োগ কখনোই রাজনৈতিক সংকটের সমাধান হতে পারে না। বরং এতে পরিস্থিতি আরও জটিল ও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। তিনি আরও জানান, বর্তমানে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলমান রয়েছে, যা একটি কূটনৈতিক সমাধানের দিকে এগোচ্ছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতামূলক ভূমিকার প্রশংসা করেন এবং বলেন, আলোচনার এই ধারা অব্যাহত থাকা জরুরি। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্দেশ্য করে সতর্ক করে বলেন, কিছু পক্ষের উসকানিতে পড়ে আবারও সংঘাতের পথে যাওয়া উচিত হবে না। তার মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ পুরো অঞ্চলকে আরও গভীর অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দেবে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতকেও একইভাবে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে আরাঘচি বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর উচিত উত্তেজনা না বাড়িয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধানের দিকে মনোযোগ দেওয়া। তার ভাষায়, এই অঞ্চলের নিরাপত্তা কারও একক সিদ্ধান্ত বা সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করতে পারে না, বরং পারস্পরিক বোঝাপড়া ও কূটনীতির মাধ্যমেই স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব।
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের একটি কথিত “প্রজেক্ট ফ্রিডম” উদ্যোগেরও সমালোচনা করেন, যেখানে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। আরাঘচি এই পরিকল্পনাকে “প্রজেক্ট ডেডলক” বলে অভিহিত করে বলেন, এটি শান্তি নয় বরং নতুন সংকট সৃষ্টি করবে।
হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে চলমান উত্তেজনার মধ্যে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে পাল্টাপাল্টি হামলার অভিযোগ উঠেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, তারা ইরানের কয়েকটি ছোট নৌযানে হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এসব হামলায় তাদের কয়েকজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত দাবি করেছে, তাদের ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং এতে অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়েছে। যদিও এসব ঘটনার বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবে পরিস্থিতি যে দ্রুত জটিল হচ্ছে তা আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের বড় একটি অংশ এই প্রণালী দিয়েই পরিবাহিত হয়। তাই এখানে কোনো ধরনের সংঘাত শুরু হলে তা শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
ইরান দীর্ঘদিন ধরেই এই প্রণালীতে নিজেদের কৌশলগত অবস্থানকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরে আসছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এই অঞ্চলে নৌ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে আস্থাহীনতা ও উত্তেজনা বহুদিন ধরেই বিদ্যমান।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক মহল মনে করছে, সংঘাত বাড়লে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। বিশেষ করে সামরিক উত্তেজনা দীর্ঘায়িত হলে তা সরাসরি জ্বালানি সরবরাহ ও বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে। বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে উভয় পক্ষকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত। তবে ইরানের বার্তা স্পষ্ট—তারা সামরিক সংঘাত নয়, বরং রাজনৈতিক সমাধানের পথেই অগ্রসর হতে চায়। এখন দেখার বিষয়, যুক্তরাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো এই বার্তাকে কীভাবে গ্রহণ করে এবং উত্তেজনা প্রশমনে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়।