প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ব জ্বালানি বাজার আবারও অস্থির হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম একদিনেই প্রায় ৬ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৪ ডলারের ওপরে উঠে যায়, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম বড় উল্লম্ফন হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্ববাজারে এই অস্থিরতা শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি, আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন কোটি কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহন করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরানের মতো তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর রপ্তানির বড় অংশ এই পথ দিয়েই আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে। ফলে এই অঞ্চলে সামান্য উত্তেজনাও বিশ্ববাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায় যখন যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে তাদের নৌবাহিনী ইরানের কয়েকটি দ্রুতগামী সামরিক নৌযানে হামলা চালিয়েছে। অপরদিকে ইরান অভিযোগ করেছে, মার্কিন বাহিনীর হামলায় বেসামরিক জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। একই সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজিরাহ অঞ্চলের একটি তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলার পর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। যদিও তেহরান সরাসরি হামলার দায় অস্বীকার করেছে, তবুও পুরো অঞ্চলে যুদ্ধের আশঙ্কা নতুন করে উসকে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ডগুলোর একটি ব্রেন্ট ক্রুড। সোমবার এর দাম প্রায় ৬ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১১৪ দশমিক ৪৪ ডলারে পৌঁছে যায়। মঙ্গলবার কিছুটা কমে ১১৩ ডলারের ঘরে নেমে এলেও বাজারে অস্থিরতা এখনো কাটেনি। বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করছেন, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে দাম ১২০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর এবারই সবচেয়ে বড় জ্বালানি সংকটের মুখে পড়তে পারে বিশ্ব।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময়ের জন্য অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে। কারণ বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করে। এর ফলে শুধু তেলের দামই নয়, প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারেও অস্থিরতা বাড়তে পারে। ইতোমধ্যে ইউরোপ ও এশিয়ার কয়েকটি দেশে গ্যাসের ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেলের দামের এই ঊর্ধ্বগতি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বড় ধরনের চাপ তৈরি করবে। বাংলাদেশসহ তেল আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাবে এবং মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হতে পারে। ইতোমধ্যেই দেশে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির আলোচনা চলছে। তার ওপর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে সরকারকে আরও বেশি ভর্তুকি দিতে হতে পারে অথবা ভোক্তা পর্যায়ে নতুন করে মূল্য সমন্বয় করতে হতে পারে।
বিশ্ববাজারের বিনিয়োগকারীরাও পরিস্থিতির দিকে সতর্ক নজর রাখছেন। নিউইয়র্ক ও লন্ডনের শেয়ারবাজারে জ্বালানি খাতের শেয়ারের দাম বাড়লেও বিমান, পরিবহন ও শিল্পখাতের শেয়ারে চাপ দেখা গেছে। কারণ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। এতে শিল্পকারখানা, বিমান পরিবহন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য খাত ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা নতুন কিছু নয়। তবে এবারের পরিস্থিতি অনেক বেশি স্পর্শকাতর। কারণ এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রশ্ন। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান উপকূলে সাম্প্রতিক সামরিক তৎপরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কঠোর ভাষায় ইরানকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মার্কিন জাহাজে হামলা হলে তার জবাব অত্যন্ত কঠোর হবে। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, রাজনৈতিক সংকটের কোনো সামরিক সমাধান নেই এবং আলোচনার মাধ্যমেই উত্তেজনা কমাতে হবে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় কূটনৈতিক আলোচনার কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি। তবে এখন পর্যন্ত উত্তেজনা প্রশমনের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি।
বিশ্ববাজারের পর্যবেক্ষকরা বলছেন, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে জ্বালানি বাজারে আরও বড় ধাক্কা আসতে পারে। তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খাদ্যপণ্য, পরিবহন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বেড়ে যায়। ফলে এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনেই এসে পড়ে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত তাই শুধু একটি আঞ্চলিক সংকট নয়, বরং এটি পুরো বিশ্বের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।