প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বর্তমান পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক সহায়তার ঘাটতি এবং দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিয়ে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের বাংলাদেশ প্রতিনিধি ইভো ফ্রেইসেনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Salahuddin Ahmed। বৈঠকে তিনি রোহিঙ্গা সংকটকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আহ্বান জানান এবং মানবিক সহায়তা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
মঙ্গলবার (৫ মে) রাজধানীর সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এই সৌজন্য সাক্ষাতে রোহিঙ্গা শিবিরের বর্তমান অবস্থা, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমে যাওয়া, সীমিত সম্পদের চ্যালেঞ্জ এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার বাংলাদেশ প্রতিনিধি Ivo Freijsen এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ মানবিক দায়িত্ববোধ থেকেই বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘ সময় ধরে এই জনগোষ্ঠীকে খাদ্য, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশকে বড় ধরনের চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন কমে যাওয়ার বিষয়টি মানবিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জীবনমান বজায় রাখতে এবং তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করা জরুরি বলেও উল্লেখ করেন মন্ত্রী।
বৈঠকে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোর বর্তমান বাস্তবতা নিয়েও আলোচনা হয়। জাতিসংঘের প্রতিনিধি জানান, সীমিত জায়গার মধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাসের কারণে ক্যাম্পগুলোতে নানা ধরনের সামাজিক ও মানবিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। স্বাস্থ্যঝুঁকি, নিরাপত্তা সমস্যা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা দিন দিন পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে।
এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় নতুন করে ক্যাম্প সম্প্রসারণ করা অত্যন্ত কঠিন। তাই এই সংকটের টেকসই সমাধান হতে পারে শুধুমাত্র রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছাসেবী এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এই সংকট চলমান থাকায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও চাপ বাড়ছে। পরিবেশ, অর্থনীতি এবং সামাজিক ভারসাম্যের ওপর এর প্রভাব পড়ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তারপরও বাংলাদেশ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেই তাদের পাশে রয়েছে।
বৈঠকে বর্তমান বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিও উঠে আসে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ বিভক্ত হয়ে পড়েছে। গাজা সংকট, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে রোহিঙ্গা সংকট যেন আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকার তালিকা থেকে হারিয়ে না যায়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুকে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে আরও জোরালোভাবে উপস্থাপন করতে হবে। একই সঙ্গে মিয়ানমারের ওপর কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়িয়ে দ্রুত প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি করার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, রোহিঙ্গা সংকট এখন শুধু বাংলাদেশের একক সমস্যা নয়, এটি একটি আন্তর্জাতিক মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি এই সংকটের কারণে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং নিরাপত্তাজনিত নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে শরণার্থী শিবিরের সাধারণ মানুষ। খাদ্য সহায়তা, চিকিৎসা ও শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে মানবিক সংকট আরও গভীর হতে পারে।
বৈঠকে ইউএনএইচসিআর প্রতিনিধি আগামী ২০ মে অনুষ্ঠিতব্য রোহিঙ্গা শরণার্থীসংক্রান্ত যৌথ সাড়া পরিকল্পনা উপস্থাপন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানান। তিনি বাংলাদেশের সহযোগিতার প্রশংসা করে বলেন, এত বড় মানবিক দায়িত্ব দীর্ঘদিন ধরে বহন করা নিঃসন্দেহে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
সাক্ষাতের শুরুতে ইভো ফ্রেইসেন নতুন দায়িত্ব গ্রহণের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানান। জবাবে মন্ত্রীও তাকে স্বাগত জানান এবং ভবিষ্যতে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় যৌথভাবে কাজ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ, যুগ্মসচিব রেবেকা খান এবং উপসচিব বেগম মিনারা নাজমীনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সব মিলিয়ে বৈঠকে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে, বাংলাদেশ এখনো মানবিক দায়িত্ব পালনে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর সহযোগিতা এবং দ্রুত প্রত্যাবাসনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।