প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চলতি মে মাসের প্রথম পাঁচ দিনেই দেশে এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে দেশে এসেছে ৬১ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার, যা প্রায় ৬২ কোটি ডলারের সমান। প্রতিদিন গড়ে দেশে এসেছে ১২ কোটি ৩২ লাখ ডলার রেমিট্যান্স, যা বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে ইতিবাচক ধারার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বুধবার (৬ মে) এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বৈধ পথে প্রবাসী আয় প্রেরণের হার বাড়া এবং ব্যাংকিং চ্যানেলের প্রতি আস্থা ফেরার কারণে এই ইতিবাচক প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
গত বছরের মে মাসের প্রথম পাঁচ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ৪৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার। সেই তুলনায় এবার প্রবৃদ্ধি স্পষ্টভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য স্বস্তির বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ৫ মে পর্যন্ত দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ২৯৯৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার। এক বছরে এই প্রবাহে প্রায় ১৯ দশমিক ৭০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ে অন্যতম ইতিবাচক অর্থনৈতিক সূচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এর আগে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৩১২ কোটি ৭৩ লাখ ডলার। মার্চ মাসে এই অঙ্ক ছিল ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার, যা দেশের ইতিহাসে একক মাস হিসেবে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহের রেকর্ড। অর্থনীতিবিদদের মতে, মার্চ মাসের এই বড় অঙ্কের প্রভাব পরবর্তী মাসগুলোতেও অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করছে।
ফেব্রুয়ারি ও জানুয়ারি মাসেও রেমিট্যান্স প্রবাহ ছিল যথাক্রমে ৩০২ কোটি ৭ লাখ ও ৩১৭ কোটি ৯ লাখ ডলার। ডিসেম্বর মাসে এই পরিমাণ ছিল ৩২২ কোটি ৬৭ লাখ ডলার। নভেম্বর ও অক্টোবর মাসেও ধারাবাহিকভাবে রেমিট্যান্স প্রবাহ ছিল ২৮৮ কোটি ৯৫ লাখ এবং ২৫৬ কোটি ৩৪ লাখ ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত অর্থবছর জুড়ে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন প্রায় ৩০ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বার্ষিক রেকর্ড। এই প্রবাহ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রেমিট্যান্স শুধু বৈদেশিক মুদ্রার উৎস নয়, এটি সরাসরি গ্রামীণ অর্থনীতি, পরিবার পর্যায়ের জীবনমান এবং ভোক্তা চাহিদার ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য এই আয় একটি বড় সহায়তা হিসেবে কাজ করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হুন্ডি বা অনানুষ্ঠানিক পথে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা কমে যাওয়াও এই বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। পাশাপাশি ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রণোদনা ও ডিজিটাল লেনদেন সহজ হওয়ায় প্রবাসীরা এখন তুলনামূলকভাবে বৈধ পথে বেশি অর্থ পাঠাচ্ছেন।
তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, প্রবাসী শ্রমবাজারের পরিবর্তন এবং মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের শ্রমনীতি পরিবর্তন ভবিষ্যতে এই প্রবাহে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই রেমিট্যান্সের এই ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে দীর্ঘমেয়াদি নীতি সহায়তা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা আশা করছেন, চলতি অর্থবছরের বাকি সময়েও রেমিট্যান্স প্রবাহ ইতিবাচক থাকবে। বিশেষ করে উৎসব মৌসুম এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারে স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে এই প্রবাহ আরও বাড়তে পারে।
অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে রেমিট্যান্স বাংলাদেশের উন্নয়ন ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। মে মাসের শুরুতেই যে শক্তিশালী প্রবাহ দেখা গেছে, তা সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতির জন্য একটি আশাব্যঞ্জক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।