প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে হাম ও এর উপসর্গজনিত রোগে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৬৫৪ জন রোগী। পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করায় স্বাস্থ্য খাতে বাড়ছে চাপ, বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের হার বেশি হওয়ায় উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম বুধবার বিকেলে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায়। এতে বলা হয়, মারা যাওয়া সাতজনের মধ্যে দুইজনের ক্ষেত্রে হাম রোগ নিশ্চিতভাবে শনাক্ত হয়েছে। বাকি পাঁচজনের ক্ষেত্রে হামের উপসর্গ থাকলেও মৃত্যুর আগে নিশ্চিত পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
চলমান পরিস্থিতিতে চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই রোগের বিস্তার যেভাবে বাড়ছে তা নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা না গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে ৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সন্দেহভাজন হামের উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৬৮ জনে। এই পরিসংখ্যান দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে।
শুধু মৃত্যুই নয়, আক্রান্তের সংখ্যাও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। ১৫ মার্চের পর থেকে এ পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছেন ৬০৯৯ জন। একই সময়ে সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৪ হাজার ২৬০ জনে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে রোগটি এখন স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপও ক্রমেই বাড়ছে। এখন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছেন ৩০ হাজার ৮৮৫ জন রোগী। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২৭ হাজার ২২৩ জন। তবে এখনো বিপুল সংখ্যক রোগী চিকিৎসাধীন থাকায় হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংকট ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হচ্ছে।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, হামের প্রধান ঝুঁকি হলো এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং শিশুদের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি করতে পারে। নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, মস্তিষ্কের সংক্রমণসহ নানা জটিলতা এই রোগের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, যা মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে যেসব শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে বা যাদের টিকা নেওয়া হয়নি, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা কার্যক্রমই হামের সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু এলাকায় টিকাদান কাভারেজ কমে যাওয়ায় সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে বলে তারা মনে করছেন। পাশাপাশি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতার ঘাটতিও এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। আক্রান্ত এলাকা চিহ্নিত করে জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। পাশাপাশি হাসপাতালগুলোতে বিশেষ ইউনিট চালু রেখে রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়। সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে হবে, বিশেষ করে শিশুদের সময়মতো টিকা নিশ্চিত করা এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। অনেকেই শিশুদের নিয়ে হাসপাতালে ভিড় করছেন, যার ফলে চিকিৎসা ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। চিকিৎসকরা অনুরোধ করেছেন, অপ্রয়োজনে হাসপাতালে ভিড় না করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে।
জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই রোগ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। শুধু জরুরি প্রতিক্রিয়া নয়, বরং টিকাদান কর্মসূচি শক্তিশালী করা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি।
দেশজুড়ে হামের এই বিস্তার এখন স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে, বিশেষ করে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমানে পুরো স্বাস্থ্য খাতের নজর এখন এই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের দিকে। তবে বাস্তবতা বলছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও সময় ও সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।