২১ দিন পর সচল ইস্টার্ন রিফাইনারি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৮ মে, ২০২৬
  • ৪ বার
২১ দিন পর সচল ইস্টার্ন রিফাইনারি

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘ ২১ দিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে আবারও উৎপাদনে ফিরেছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। শুক্রবার (৮ মে) সকাল থেকে চট্টগ্রামে অবস্থিত এই গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনাটিতে পুনরায় পরিশোধন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক শিপিং সংকটের কারণে অপরিশোধিত তেল আমদানিতে যে জটিলতা তৈরি হয়েছিল, নতুন চালান দেশে পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে অবশেষে তার অবসান ঘটেছে।

জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন পুনরায় শুরু হওয়া দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের স্বস্তির খবর। কারণ এই শোধনাগারটি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে সরকারকে অধিক দামে বিদেশ থেকে পরিশোধিত তেল আমদানি করতে হয়, যা একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থাও ঝুঁকির মুখে পড়ে।

রিফাইনারি সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টার পর থেকেই কারখানার অভ্যন্তরে ধীরে ধীরে যান্ত্রিক কার্যক্রম চালু করা হয়। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার কারণে বিভিন্ন ইউনিটে কারিগরি সমন্বয় এবং নিরাপত্তা পরীক্ষা সম্পন্ন করতে কিছুটা সময় লাগে। ফলে প্রথম কয়েক ঘণ্টা সীমিত পরিসরে কার্যক্রম পরিচালনা করা হলেও শুক্রবার সকাল থেকে পুরোদমে উৎপাদন শুরু হয়। ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসির উপমহাব্যবস্থাপক (অপারেশন্স) মামুনুর রশীদ খান জানিয়েছেন, বর্তমানে দৈনিক প্রায় সাড়ে ৩ হাজার টন তেল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে যান্ত্রিক কিছু সমন্বয়ের কারণে উৎপাদনের গতি তুলনামূলক কম রাখা হলেও ধীরে ধীরে তা বাড়ানো হবে। তিনি বলেন, দীর্ঘ বিরতির পর যেকোনো শিল্প ইউনিট পুনরায় সচল করতে সতর্কতার সঙ্গে ধাপে ধাপে অগ্রসর হতে হয়। নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করেই পূর্ণ সক্ষমতায় যাওয়া হবে।

দীর্ঘদিন পর নতুন করে প্রাণ ফিরে পাওয়ার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে সৌদি আরব থেকে আসা বিশাল এক অপরিশোধিত তেলের চালান। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রায় ১ লাখ ৯৪ হাজার টন ক্রুড অয়েল বহনকারী ‘এমটি নিনেমিয়া’ নামের একটি জাহাজ বর্তমানে কক্সবাজারের কুতুবদিয়া বহির্নোঙরে অবস্থান করছে। সেখান থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে অপরিশোধিত তেল খালাস করে চট্টগ্রামের রিফাইনারিতে পাঠানো হচ্ছে।

এই তেলের চালান পৌঁছানোর পরই ইস্টার্ন রিফাইনারির প্রায় নিস্তেজ হয়ে পড়া ইউনিটগুলোতে নতুন করে কার্যক্রম শুরু হয়। শোধনাগারের ভেতরে আবারও কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। প্রযুক্তিবিদ, প্রকৌশলী ও কর্মীরা সমন্বিতভাবে উৎপাদন প্রক্রিয়া সচল রাখতে কাজ করছেন। দীর্ঘদিন পর উৎপাদন শুরু হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মীদের মাঝেও স্বস্তি ও আশাবাদ দেখা গেছে।

ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরীফ হাসনাত বলেন, এটি ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জের সময়। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় উৎপাদন বন্ধ করতে হয়েছিল। তবে এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে পরিকল্পিতভাবে কাজ চলছে। তিনি বলেন, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানটি নিরবচ্ছিন্নভাবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে যেন এমন সংকট তৈরি না হয়, সে দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

মূলত মার্চ ও এপ্রিল মাসে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক শিপিং রুটে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে বাংলাদেশে অপরিশোধিত তেল পরিবহন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী কোনো জাহাজ দেশে পৌঁছাতে না পারায় ইস্টার্ন রিফাইনারির মজুদ দ্রুত কমে যেতে থাকে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে উৎপাদনের গতি কমিয়ে আনতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। পরে মজুদ তলানিতে ঠেকলে পুরোপুরি উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইস্টার্ন রিফাইনারি দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। এই শোধনাগার সচল থাকলে ডিজেল, পেট্রল, অকটেনসহ বিভিন্ন জ্বালানির অভ্যন্তরীণ সরবরাহ অনেক বেশি স্থিতিশীল থাকে। কৃষি, শিল্প, পরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো এই সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। ফলে শোধনাগারের দীর্ঘ বন্ধ অবস্থা পুরো অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে পরিশোধিত তেলের দাম সাধারণত অপরিশোধিত তেলের তুলনায় অনেক বেশি। তাই স্থানীয়ভাবে শোধন কার্যক্রম চালু থাকলে সরকারের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হয়। পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থাও আরও নিয়ন্ত্রিত রাখা সম্ভব হয়। সেই দিক থেকে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন পুনরায় শুরু হওয়া অর্থনীতির জন্যও ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।

ইস্টার্ন রিফাইনারি সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে যে পরিমাণ ক্রুড অয়েল মজুদ রয়েছে, তা দিয়ে আগামী ২০ থেকে ২৫ দিন নির্বিঘ্নে পরিশোধন কার্যক্রম চালানো সম্ভব হবে। তবে ভবিষ্যতে যেন আর সংকট তৈরি না হয়, সেজন্য আগাম প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। আগামী ২০ মের পর আরও একটি বড় তেলের চালান দেশে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানা গেছে।

কর্মকর্তারা আশা করছেন, সৌদি আরব থেকে চলতি মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখের মধ্যে নতুন চালানের লোডিং সম্পন্ন হবে। সেই চালানেও প্রায় ১ লাখ টনের মতো অপরিশোধিত তেল থাকতে পারে। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী জাহাজটি দেশে পৌঁছালে দেশের জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্থিতিশীল থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকলেও বাজারে বড় ধরনের জ্বালানি সংকট এড়াতে সরকার বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে সরবরাহ চালু রেখেছিল। তবে এতে সরকারের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এখন রিফাইনারি চালু হওয়ায় সেই চাপ কিছুটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

চট্টগ্রামের স্থানীয় বাসিন্দা ও শ্রমিকদের মধ্যেও রিফাইনারি সচল হওয়াকে ঘিরে স্বস্তি দেখা গেছে। কারণ এই শিল্প প্রতিষ্ঠানটি শুধু জ্বালানি উৎপাদনের কেন্দ্র নয়, বরং হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় অনেকের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন যেকোনো দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত মজুদ এবং বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। ইস্টার্ন রিফাইনারির সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

২১ দিনের বিরতির পর আবারও যখন ইস্টার্ন রিফাইনারির চিমনি থেকে ধোঁয়া উঠতে শুরু করেছে, তখন সেটি শুধু একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন শুরুর খবর নয়; বরং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের প্রতীক হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত