হরমুজ উত্তেজনায় ফের বাড়ল বিশ্ববাজারে তেলের দাম

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৮ মে, ২০২৬
  • ৩ বার
হরমুজ উত্তেজনায় ফের বাড়ল বিশ্ববাজারে তেলের দাম

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় আবারও অস্থির হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার। কয়েকদিনের স্বস্তির পর আন্তর্জাতিক বাজারে ফের বাড়তে শুরু করেছে অপরিশোধিত তেলের দাম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক রুটে সংঘাতের আশঙ্কা বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে তেল সরবরাহ ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর। আর সেই বাস্তবতার প্রতিফলনই দেখা যাচ্ছে বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, শুক্রবার এশিয়ার বাজারে লেনদেন শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০২ দশমিক ৭০ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই ক্রুডের দামও বেড়ে প্রায় ৯৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে। কয়েকদিন আগেও বাজারে দাম কিছুটা কমতির দিকে থাকলেও নতুন উত্তেজনার কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আবারও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বিশ্ব জ্বালানি বাজারে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই সরু জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ চলাচল করে। সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের মতো তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর জ্বালানি রপ্তানির বড় অংশ এই রুটের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সেখানে সামান্য উত্তেজনাও বৈশ্বিক বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।

সাম্প্রতিক উত্তেজনার সূত্রপাত ঘটে হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহর বহর চলাচলকে কেন্দ্র করে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, উপসাগরীয় এলাকা থেকে তাদের যুদ্ধজাহাজ সরিয়ে নেওয়ার সময় ইরান ‘উসকানিমূলক’ হামলা চালায়। ওয়াশিংটনের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলায় ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং ছোট নৌযান ব্যবহার করা হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তাদের বাহিনী দ্রুত আত্মরক্ষামূলক পাল্টা ব্যবস্থা নেয় এবং কোনো যুদ্ধজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।

অন্যদিকে ইরানের সামরিক বাহিনী সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি করেছে। তেহরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রই প্রথমে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে তাদের সামরিক জাহাজ ও একটি তেলবাহী ট্যাংকারকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, পাল্টা জবাবে মার্কিন যুদ্ধজাহাজে ‘গুরুত্বপূর্ণ ক্ষতি’ করা হয়েছে। যদিও ওয়াশিংটন এই দাবিকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে।

দুই দেশের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে ছোট একটি সংঘর্ষও বড় ধরনের আঞ্চলিক সংকটে রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মতো দুই শক্তিশালী পক্ষ সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে তার প্রভাব শুধু জ্বালানি বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বৈশ্বিক বাণিজ্য, শেয়ারবাজার এবং কূটনৈতিক সম্পর্কেও বড় ধাক্কা লাগতে পারে।

এই উত্তেজনার মধ্যেই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump গত ২১ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির সময়সীমা অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন। তার প্রশাসন জানিয়েছিল, শান্তি আলোচনা অব্যাহত রাখতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা সেই প্রচেষ্টাকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

তবে ট্রাম্প পরিস্থিতিকে তুলনামূলকভাবে ‘ছোটখাটো আঘাত’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, যুদ্ধবিরতি এখনো কার্যকর রয়েছে এবং উভয় পক্ষই বড় ধরনের সংঘাতে যেতে চায় না। একইসঙ্গে ইরানের প্রতি কড়া হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি। ট্রাম্প বলেন, তেহরান যদি সমঝোতার পথে না আসে, তাহলে আবারও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।

বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার প্রভাব ইতোমধ্যেই বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করেছে। তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলো নতুন করে উদ্বেগে পড়েছে। কারণ অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় এবং শিল্পখাতের উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে খাদ্যপণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজারেও। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল। কারণ দেশের জ্বালানি খাত বড় অংশেই আমদানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে গেলে সরকারকে অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়। একইসঙ্গে ভর্তুকির চাপও বাড়ে। সম্প্রতি দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারিতে উৎপাদন বন্ধ থাকায় জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, তার মধ্যেই বৈশ্বিক বাজারে নতুন মূল্যবৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজারের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো সরবরাহ ব্যবস্থা। যদি হরমুজ প্রণালিতে সামরিক উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায় বা জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। এর ফলে দাম আরও দ্রুত বাড়তে পারে। ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে অনেক বিনিয়োগকারী নিরাপদ অবস্থানে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, যা বাজারে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে।

এদিকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও কূটনৈতিক মহল দুই পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘের পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বৈশ্বিক অর্থনীতি এখনও বিভিন্ন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে নতুন কোনো বড় যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে। তাই আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানো এখন সবচেয়ে জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তেলের বাজারে বর্তমান মূল্যবৃদ্ধি হয়তো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। তবে উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে। শুধু জ্বালানি নয়, বিশ্বজুড়ে পরিবহন, শিল্প, কৃষি এবং দৈনন্দিন পণ্যের বাজারেও এর প্রভাব পড়বে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির দিকে এখন পুরো বিশ্বের দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে।

হরমুজ প্রণালিতে সামরিক উত্তেজনা এবং বিশ্ববাজারে তেলের দামের এই নতুন ঊর্ধ্বগতি আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে, আধুনিক বিশ্বের অর্থনীতি কতটা গভীরভাবে জ্বালানি সরবরাহ ও ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে জড়িত। আর সেই কারণেই মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি ঘটনাই এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত