প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জুলাই বিপ্লব ঘিরে দেশের রাজনৈতিক ও বিচারিক অঙ্গনে আলোচিত মোহাম্মদপুরের ফাইয়াজ-সৈকতসহ ৯ হত্যা মামলায় আজ গুরুত্বপূর্ণ দিন। রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র Fazle Noor Taposh, সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী Jahangir Kabir Nanakসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের বিষয়ে আজ আদেশ দেওয়ার কথা রয়েছে।
রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ বিষয়ে আদেশ দেবেন। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল শুনানি শেষে এই দিন নির্ধারণ করেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
মামলাটি ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন, মানবাধিকার মহল এবং আইনবিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা চলছে। কারণ, এই মামলায় শুধু রাজনৈতিক নেতাই নন, পুলিশের উচ্চপর্যায়ের কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে মোহাম্মদপুর এলাকায় চলমান ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমন করতে পরিকল্পিতভাবে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়।
আসামিদের তালিকায় রয়েছেন তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক অ্যাডিশনাল ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ারদার, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকারসহ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের একাধিক নেতাকর্মী। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আন্দোলন দমনের নামে রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করে নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালানোর অভিযোগের ভিত্তিতেই এই মামলা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গড়ায়।
বর্তমানে এই মামলায় চার আসামি গ্রেপ্তার অবস্থায় রয়েছেন। তারা হলেন নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের মোহাম্মদপুর থানা শাখার সভাপতি নাঈমুল হাসান রাসেল, সহসভাপতি সাজ্জাদ হোসেন, ওমর ফারুক এবং ফজলে রাব্বি। গতকাল সকালে কারাগার থেকে তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
এর আগে ৭ মে আদেশ ঘোষণার দিন ধার্য ছিল। তবে পরে ট্রাইব্যুনাল নতুন করে ১০ মে দিন নির্ধারণ করেন। গত ২৬ এপ্রিল প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের শুনানি শেষ হয়। এরপর আদালত আদেশের জন্য দিন ঠিক করেন।
প্রসিকিউশনের আনা অভিযোগে বলা হয়েছে, আন্দোলন দমনে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক নির্দেশনা কার্যকর করা হয়েছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকারের শীর্ষপর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন এবং আন্দোলন দমনে পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশনা দিতেন। অভিযোগে আরও বলা হয়, পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
প্রথম অভিযোগে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৭ ও ১৮ জুলাই তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান ওয়্যারলেস বার্তার মাধ্যমে চাইনিজ রাইফেল ব্যবহারের নির্দেশ দেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, সেই নির্দেশের পর মোহাম্মদপুর থানা এলাকায় আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়।
প্রসিকিউশনের ভাষ্যমতে, ১৮ জুলাই মোহাম্মদপুর থানায় উপস্থিত হয়ে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার এবং এডিসি রৌশানুল হক সৈকত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের চাইনিজ রাইফেল ব্যবহারের নির্দেশ দেন। তদন্তে দাবি করা হয়েছে, ওই সময় থানার অস্ত্রাগার থেকে দুই শতাধিক রাউন্ড চাইনিজ রাইফেলের গুলি এবং প্রায় ১৮০০ রাউন্ড শর্টগানের গুলি সরবরাহ করা হয়।
এই অভিযানের সময় ফারহান ফাইয়াজ গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। একই ঘটনায় গুরুতর আহত হন ফাতহীন মহতাদী ত্বকী। প্রসিকিউশন বলছে, এসব ঘটনা আসামিদের প্রত্যক্ষ নির্দেশনা ও জ্ঞাতসারেই সংঘটিত হয়েছে।
দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৮ জুলাই মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড, বসিলা রোড, নূর জাহান রোড এবং আশপাশের এলাকায় আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে চাইনিজ রাইফেল, শটগান, গ্যাস শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়। একপর্যায়ে নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি চালানো হলে রিকশাচালক মাহিন মিয়া ও রনি নিহত হন। আহত হন অসংখ্য শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ।
তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯ জুলাই মোহাম্মদপুর থানাসংলগ্ন এলাকায় আল শাহরিয়ার হোসেন রোকনসহ আরও ছয়জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। একই ঘটনায় নাহিদ হাসানসহ অন্তত আটজন গুরুতর আহত হন। তদন্ত প্রতিবেদনে এসব ঘটনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত সংস্থা বলছে, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় মোহাম্মদপুর এলাকায় সংঘটিত সহিংসতা ছিল সুপরিকল্পিত। তদন্ত শেষে ২৮ জনের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। মামলায় অন্তত ৫০ জন সাক্ষী আদালতে জবানবন্দি দেবেন বলে জানিয়েছে প্রসিকিউশন।
চিফ প্রসিকিউটর আদালতে বলেন, আসামিদের উসকানি, পরিকল্পনা এবং প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহযোগিতায় ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। এতে মাহমুদুর রহমান সৈকত, ফারহান ফাইয়াজসহ ৯ জন নিহত হন এবং অসংখ্য মানুষ আহত হন। তিনি দাবি করেন, এসব হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং আন্দোলন দমন অভিযানের অংশ ছিল।
এদিকে মামলাটি ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনেও উত্তেজনা বিরাজ করছে। সরকারপক্ষ বলছে, জুলাই বিপ্লবে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অন্যদিকে অভিযুক্তদের আইনজীবীরা অভিযোগ অস্বীকার করে বলছেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই তাদের মক্কেলদের জড়ানো হয়েছে।
আজকের আদেশের মধ্য দিয়ে মামলাটির বিচারিক প্রক্রিয়া নতুন ধাপে প্রবেশ করতে পারে। অভিযোগ গঠন হলে আনুষ্ঠানিক সাক্ষ্যগ্রহণ ও বিচার কার্যক্রম শুরু হবে। ফলে বহুল আলোচিত এই মামলার দিকে এখন নজর দেশের রাজনৈতিক মহল, মানবাধিকার সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের।