প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির (এআরটি) প্রভাব বাংলাদেশের আমদানি খাতে দ্রুতই দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর মাত্র চার মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশের আমদানি আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে বলে জানিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
সরকারি ও বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ১৯ হাজার ১০৪ কোটি টাকার পণ্য আমদানি করেছে। গত বছরের একই সময়ে এই অঙ্ক ছিল প্রায় ৯ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমদানি বেড়েছে ১০১ শতাংশেরও বেশি।
এই সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে অনেক কম। রপ্তানি বেড়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৩২ শতাংশ, যার মোট মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। ফলে দুই দেশের বাণিজ্য ভারসাম্য এখনো বাংলাদেশের পক্ষে থাকলেও আমদানির দ্রুত বৃদ্ধির কারণে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তনের পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে দুই দেশের মধ্যে হওয়া নতুন বাণিজ্য কাঠামো। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় Office of the United States Trade Representative-এর সঙ্গে আলোচনার পর “অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড” বা এআরটি চুক্তির মাধ্যমে শুল্ক ও বাজার প্রবেশাধিকার সংক্রান্ত নতুন সমঝোতা হয়। চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয় ২০২৬ সালের শুরুর দিকে জাতীয় নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে, যা নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে।
চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক হাজার পণ্যের ওপর শুল্ক হ্রাস বা প্রত্যাহারে সম্মত হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশের নির্দিষ্ট কিছু রপ্তানি পণ্যের ওপর প্রতিশোধমূলক শুল্ক প্রত্যাহার বা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। তবে গড়ে এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মোস্ট-ফেভারড-নেশন (এমএফএন) শুল্ক বহাল রয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চুক্তির ফলে আমদানি প্রবাহে বড় পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে জ্বালানি, খাদ্যশস্য এবং শিল্প কাঁচামাল আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, মোট আমদানির প্রায় ৩৮ শতাংশই করেছে সরকারি তিনটি সংস্থা—পেট্রোবাংলা, খাদ্য অধিদপ্তর এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস।
সবচেয়ে বেশি আমদানি হয়েছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), এলপিজি, গম, তুলা এবং উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ। এর মধ্যে এলএনজি আমদানি একাই কয়েক হাজার কোটি টাকার। খাদ্য নিরাপত্তা ও জ্বালানি চাহিদা মেটাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এই পণ্যগুলো আমদানি বাড়ানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
Bangladesh Petroleum Corporation এবং Department of Food Bangladesh-এর মতো সংস্থাগুলোর বড় আমদানির কারণে সরকারি ব্যয়ও বেড়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতেও তুলা, সয়াবিন ও শিল্প কাঁচামালের আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রবণতা একদিকে যেমন সরবরাহ নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যদি রপ্তানি আয় সেই অনুপাতে না বাড়ে, তাহলে বাণিজ্য ঘাটতি আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, চুক্তির ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক আদালতের কিছু রায় এই চুক্তির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। তার মতে, বাংলাদেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি থেকে তুলনামূলক বেশি সুবিধা পাচ্ছে।
অন্যদিকে নীতি গবেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশকে কিছু কৌশলগত ছাড় দিতে হয়েছে। তবে এই ছাড় দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় শিল্পের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা এখনই বলা কঠিন।
বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিও এই বাণিজ্য চুক্তির বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখছে। জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলের চাপ এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে আমদানি কাঠামো দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানি থেকে বড় আকারে উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে, যা এই বাণিজ্য প্রবণতার আরেকটি বড় উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আমদানি বৃদ্ধি স্বল্পমেয়াদে অর্থনৈতিক ভারসাম্যকে চাপের মধ্যে ফেললেও দীর্ঘমেয়াদে তা অবকাঠামো ও জ্বালানি নিরাপত্তায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে—যদি সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা যায়।
এখন নজর থাকবে আগামী মাসগুলোতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এই আমদানি বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে পারে কি না, তার ওপর। কারণ অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষায় রপ্তানি ও আমদানি প্রবাহের সমন্বয়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।