৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেট আসছে

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১০ মে, ২০২৬
  • ৮ বার

প্রকাশ: ১০ মে  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য দেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় আকারের বাজেট প্রণয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে পাওয়া প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, আসন্ন বাজেটের আকার দাঁড়াতে পারে প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা বিদ্যমান অর্থবছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। নতুন বাজেটের মূল লক্ষ্য হিসেবে ধরা হতে পারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশের কাছাকাছি।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং অভ্যন্তরীণ আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেই এই বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে। ফলে বাজেটের আকার বড় হলেও তার বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে, আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করা হতে পারে। এই বাজেটের মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্প, সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং রাজস্ব ব্যবস্থার কাঠামোতে নতুন দিকনির্দেশনা আসতে পারে।

এবারের বাজেটকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটি বর্তমান সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বাজেটের আকার বড় করা হলেও রাজস্ব আদায় এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা না থাকলে অর্থনীতিতে চাপ বাড়তে পারে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হতে পারে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বাকি ঘাটতি অর্থায়নের জন্য অভ্যন্তরীণ ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হতে পারে। তবে এই ঘাটতি অর্থায়ন ব্যবস্থাপনা নিয়েই সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করছেন অর্থনীতিবিদরা।

অর্থনীতিবিদ ও নীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এখনো অস্থিরতা বিরাজ করছে। মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জ্বালানি বাজারের ওঠানামা এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার চাপ বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে, যা সরাসরি মূল্যস্ফীতিকে প্রভাবিত করবে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, সম্প্রসারণমূলক বাজেট যদি উৎপাদন বৃদ্ধি না ঘটায়, তাহলে বাজারে অতিরিক্ত অর্থ প্রবাহ মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়াতে পারে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাজেট প্রণয়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির চাপ—দুটিই এখন নাজুক অবস্থায় রয়েছে। ফলে বাজেট বাস্তবায়নে দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে বাংলাদেশে অতীতে উচ্চ প্রবৃদ্ধির অভিজ্ঞতা থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই গতি কিছুটা কমেছে বলে মত দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন মনে করেন, ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য বাস্তবসম্মত। তার মতে, অতীতে প্রবৃদ্ধি প্রায় ৮ শতাংশে পৌঁছালেও বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ লক্ষ্য হতে পারে।

এদিকে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ বলেন, বাজেটের আকার বড় করা অর্থনীতিকে সচল রাখার জন্য জরুরি, তবে এর পাশাপাশি সুশাসন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, রাজস্ব ব্যবস্থার দক্ষতা না বাড়ালে বড় বাজেট কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারবে না।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন সতর্ক করে বলেছেন, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং সরবরাহ সংকট অব্যাহত থাকলে সম্প্রসারণমূলক বাজেট উল্টো চাপ তৈরি করতে পারে। তার মতে, উৎপাদন না বাড়িয়ে শুধুমাত্র চাহিদা বৃদ্ধি করা হলে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যেতে পারে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আগামী বাজেটে উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক সুরক্ষা খাত এবং অবকাঠামো উন্নয়নে বড় অঙ্কের বরাদ্দ রাখা হতে পারে। পাশাপাশি ডিজিটাল অর্থনীতি এবং কর ব্যবস্থার সংস্কারেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন একটি সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে। একদিকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাড়ানোর চাপ, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখার চ্যালেঞ্জ—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে সামলাতে হবে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, বাজেট শুধু আকারে বড় হলেই চলবে না, বরং এর কার্যকর বাস্তবায়নই হবে মূল চ্যালেঞ্জ। সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা না থাকলে বড় বাজেটও কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে ব্যর্থ হতে পারে।

সব মিলিয়ে আসন্ন ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেটকে ঘিরে অর্থনীতিতে যেমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তেমনি রয়েছে সতর্কতার বার্তাও। এখন নজর ১১ জুনের জাতীয় বাজেট ঘোষণার দিকে, যেখানে দেশের আগামী অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত