মধ্যস্থতা নাকি গোপন সহায়তা? ইরান ইস্যুতে চাপে পাকিস্তান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬
  • ৭ বার
মধ্যস্থতা নাকি গোপন সহায়তা? ইরান ইস্যুতে চাপে পাকিস্তান

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা নতুন মাত্রা পাওয়ার পর কূটনৈতিকভাবে নিজেকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরেছিল পাকিস্তান। ইসলামাবাদ তখন প্রকাশ্যে যুদ্ধবিরতি, সংলাপ এবং উত্তেজনা প্রশমনের পক্ষে অবস্থান নেয়। কিন্তু সাম্প্রতিক এক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, একই সময়ে পাকিস্তান নীরবে ইরানের কিছু সামরিক ও প্রতিরক্ষা সম্পদ নিজেদের বিমানঘাঁটিতে রাখার অনুমতি দিয়েছিল, যাতে সেগুলো সম্ভাব্য মার্কিন বা ইসরাইলি হামলা থেকে রক্ষা পায়। এমন অভিযোগ সামনে আসার পর কূটনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক, আর ওয়াশিংটনে উঠেছে পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়ে কঠিন প্রশ্ন।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান সংঘাত শুরুর পর তাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সামরিক বিমান ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম পাকিস্তানের নুর খান বিমানঘাঁটিতে সরিয়ে নেয়। রাওয়ালপিন্ডির কাছে অবস্থিত পাকিস্তান বিমান বাহিনীর এই ঘাঁটিটি দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা হিসেবে পরিচিত। কৌশলগত অবস্থানের কারণে এটি দীর্ঘদিন ধরেই পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচিত।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইরান শুধু পাকিস্তানেই নয়, কিছু বেসামরিক বিমান আফগানিস্তানেও অস্থায়ীভাবে সরিয়ে নিয়েছিল। যদিও ওইসব বিমানের মধ্যে সামরিক সরঞ্জাম ছিল কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে দাবি করা হয়েছে, তেহরান সম্ভাব্য বিমান হামলার আশঙ্কায় তাদের অবশিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সম্পদ নিরাপদ স্থানে সরিয়ে রাখার পরিকল্পনা নেয় এবং পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকে সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ব্যবহার করে।

সবচেয়ে আলোচিত তথ্যটি হলো, পাকিস্তানের নুর খান ঘাঁটিতে ইরানের একটি আরসি-১৩০ বিমান রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। আরসি-১৩০ মূলত মার্কিন নির্মাতা লকহিডের সি-১৩০ হারকিউলিস পরিবহন বিমানের একটি বিশেষ সংস্করণ, যা গোয়েন্দা নজরদারি ও পর্যবেক্ষণ কাজে ব্যবহৃত হয়। এই ধরনের বিমান সাধারণত অত্যন্ত সংবেদনশীল সামরিক কার্যক্রমে ব্যবহৃত হওয়ায় বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

সিবিএসের প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump এপ্রিলের শুরুতে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়ার কয়েকদিন পরই এসব সামরিক সম্পদ পাকিস্তানে সরিয়ে নেওয়া হয়। মার্কিন প্রশাসনের ধারণা, এটি ছিল ইরানের একটি কৌশলগত পদক্ষেপ, যার মাধ্যমে তারা সংঘাত চলাকালে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ বিমান ও সামরিক সক্ষমতাকে নিরাপদ রাখতে চেয়েছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, পুরো ঘটনাটি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতায় পাকিস্তানের অবস্থানকে নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে ইসলামাবাদ নিজেকে কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরছে, অন্যদিকে গোপনে ইরানকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ উঠলে তা পাকিস্তানের নিরপেক্ষতা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশ্ন তৈরি করবে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই ওঠানামার মধ্যে রয়েছে। আফগানিস্তান যুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদবিরোধী অভিযান এবং চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইসলামাবাদের দূরত্ব বহুবার প্রকাশ্যে এসেছে। নতুন এই অভিযোগ সেই সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।

ওয়াশিংটনে বিষয়টি ইতোমধ্যে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। মার্কিন সিনেটের প্রভাবশালী রিপাবলিকান সদস্য Lindsey Graham সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বক্তব্যে পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, যদি প্রতিবেদনটি সত্য হয়, তাহলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকার পূর্ণ পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন হবে। ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ এই সিনেটরের বক্তব্যকে অনেকেই ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ মনোভাবের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।

তবে পাকিস্তান সরকার অভিযোগটি সরাসরি অস্বীকার করেছে। দেশটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সিবিএস নিউজকে বলেন, নুর খান ঘাঁটিতে বিপুল সংখ্যক বিদেশি বিমান গোপনে রাখা সম্ভব নয়, কারণ এটি একটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার মাঝখানে অবস্থিত। তার ভাষায়, এমন কিছু ঘটলে তা সাধারণ মানুষের চোখ এড়িয়ে যেত না। পাকিস্তানি কর্মকর্তারা আরও দাবি করেন, ইসলামাবাদ কেবল আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছে এবং কোনো সামরিক পক্ষপাতমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত নয়।

অন্যদিকে আফগানিস্তানের পক্ষ থেকেও আংশিক তথ্য সামনে এসেছে। আফগান বেসামরিক বিমান চলাচল বিভাগের এক কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন যে, যুদ্ধ শুরুর পর একটি ইরানি বেসামরিক বিমান কিছু সময়ের জন্য কাবুল বিমানবন্দরে অবস্থান করেছিল। ইরানের আকাশসীমা বন্ধ থাকায় বিমানটি সাময়িকভাবে সেখানে রাখা হয়েছিল বলে জানানো হয়। পরে নিরাপত্তাজনিত কারণে সেটিকে পশ্চিমাঞ্চলীয় হেরাত বিমানবন্দরে সরিয়ে নেওয়া হয়।

এই প্রসঙ্গে আফগানিস্তান-পাকিস্তান সম্পর্কের টানাপোড়েনও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সম্প্রতি পাকিস্তান অভিযোগ তোলে, আফগান তালেবান প্রশাসন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানকে নিরাপদ আশ্রয় দিচ্ছে। সেই উত্তেজনার জেরে মার্চ মাসে কাবুলের আশপাশে পাকিস্তানের সীমিত সামরিক হামলার ঘটনাও ঘটে। ফলে আফগানিস্তানে ইরানি বিমানের অবস্থান ও স্থানান্তর নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এমন পরিস্থিতি নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন দেশ প্রকাশ্যে নিরপেক্ষ অবস্থান নিলেও গোপনে মিত্র রাষ্ট্রকে সহায়তা দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল, কারণ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল, ইরান এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিকে প্রভাবিত করছে। পাকিস্তান যদি সত্যিই ইরানের সামরিক সম্পদ রক্ষায় ভূমিকা পালন করে থাকে, তাহলে তা কেবল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নয়, পুরো অঞ্চলের কৌশলগত ভারসাম্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তান বর্তমানে অত্যন্ত সূক্ষ্ম এক কূটনৈতিক অবস্থানে রয়েছে। একদিকে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি নষ্ট করতে চায় না, অন্যদিকে প্রতিবেশী ইরান ও চীনের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্কও ধরে রাখতে চায়। তাই ইসলামাবাদ প্রকাশ্যে নিরপেক্ষতা বজায় রাখলেও বাস্তবে কতটা ভারসাম্য রাখতে পারছে, সেই প্রশ্নই এখন সামনে চলে এসেছে।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে তীব্র আলোচনা চলছে। কেউ কেউ পাকিস্তানকে মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের অংশ হিসেবে দেখছেন, আবার অনেকে মনে করছেন, মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় থেকে একই সঙ্গে গোপন সামরিক সহায়তা দেওয়া আন্তর্জাতিক আস্থার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। বিশেষ করে ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়া ভবিষ্যতে পাকিস্তানের সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে সিবিএস নিউজের এই প্রতিবেদন দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক সমীকরণে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ অস্বীকার করলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিষয়টি এখন গভীর পর্যবেক্ষণের মধ্যে রয়েছে। আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান ও ইরানের সম্পর্ক কোন দিকে মোড় নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত