মোটরসাইকেলে অগ্রিম কর আদায়ে নতুন ভাবনা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬
  • ১৫ বার
মোটরসাইকেল মালিকদের থেকে অগ্রিম আয়কর

প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশে মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের জন্য নতুন এক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। আগামী অর্থবছরের বাজেটকে সামনে রেখে মোটরসাইকেল মালিকদের কাছ থেকে অগ্রিম আয়কর আদায়ের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতূহল, উদ্বেগ এবং বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যাদের করযোগ্য আয় নেই, অথচ জীবিকার প্রয়োজনে মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন, তাদের মধ্যে এই আলোচনা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং করের আওতা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে মোটরসাইকেলসহ কর নেটওয়ার্কের বাইরে থাকা যানবাহনকে অগ্রিম আয়করের আওতায় আনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে অটোরিকশাকেও নতুন কর ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা চলছে।

বর্তমানে মোটরসাইকেল মালিকদের প্রতি বছর ট্যাক্স টোকেন ফি দিতে হয় এবং নির্ধারিত সময় শেষে সেটি নবায়ন করতে হয়। তবে নতুন পরিকল্পনায় ট্যাক্স টোকেনের পাশাপাশি অগ্রিম আয়কর যুক্ত করার আলোচনা চলছে। এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রায় ৪৯ লাখ নিবন্ধিত মোটরসাইকেল মালিকের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোটরসাইকেলের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। ব্যক্তিগত যাতায়াতের পাশাপাশি জীবিকার মাধ্যম হিসেবেও এখন মোটরসাইকেলের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে রাইড শেয়ারিং, পণ্য পরিবহন এবং ছোটখাটো ব্যবসার কাজে অনেকেই মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভরশীল।

এমন পরিস্থিতিতে নতুন অগ্রিম আয়করের প্রস্তাব নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ এটিকে কর ব্যবস্থার আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে দেখছেন, আবার অনেকের মতে এটি মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত টিন নম্বরের ভিত্তিতে অগ্রিম আয়কর আদায়ের চিন্তা করা হচ্ছে। অর্থাৎ যাদের মোটরসাইকেল রয়েছে, তাদের কর শনাক্তকরণ নম্বরের আওতায় এনে ধীরে ধীরে কর ব্যবস্থার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে এখানেই দেখা দিয়েছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। দেশের বিপুলসংখ্যক মোটরসাইকেল মালিকের করযোগ্য আয় নেই এবং তাদের টিন নম্বরও নেই। ফলে কীভাবে এই কর আদায় করা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। কেউ কেউ মনে করছেন, ট্যাক্স টোকেন নবায়নের সময়ই অগ্রিম কর আদায়ের ব্যবস্থা করা হতে পারে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান বদিউর রহমান এই উদ্যোগকে ইতিবাচক বলে মনে করছেন। তার মতে, করযোগ্য আয়ের ন্যূনতম সীমার নিচে থাকলেও মানুষ যেন কর ব্যবস্থার অংশ হতে পারে, সে সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। তবে তিনি বলেছেন, করের হার অবশ্যই যৌক্তিক হতে হবে এবং আদায়ের পদ্ধতিও সহজ ও বাস্তবসম্মত হতে হবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১১০ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল নতুন করের বাইরে রাখা হতে পারে। তবে ১১১ থেকে ১২৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেলের জন্য বছরে দুই হাজার টাকা, ১৬৫ সিসি পর্যন্ত পাঁচ হাজার টাকা এবং এর বেশি সিসির মোটরসাইকেলের জন্য দশ হাজার টাকা পর্যন্ত অগ্রিম আয়কর নির্ধারণের আলোচনা চলছে।

অন্যদিকে অটোরিকশার ক্ষেত্রেও নতুন কর কাঠামো বিবেচনা করা হচ্ছে। সিটি করপোরেশন এলাকায় চলাচলকারী ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার জন্য পাঁচ হাজার টাকা, পৌর এলাকায় দুই হাজার এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে এক হাজার টাকা কর নির্ধারণের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।

তবে এই পরিকল্পনার খবর প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই মোটরসাইকেল মালিক ও চালকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রধান কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন অনেক বাইক চালক ও মালিক।

বিক্ষোভকারীরা বলেছেন, বাংলাদেশে মোটরসাইকেলের দাম প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। এর ওপর নতুন অগ্রিম আয়কর আরোপ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলবে। বিশেষ করে যারা মোটরসাইকেলকে জীবিকার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন, তাদের জন্য এটি বড় চাপ হয়ে দাঁড়াবে।

ঢাকার কয়েকজন বাইক চালক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তারা ইতোমধ্যে ট্যাক্স টোকেন ফি দেন। নতুন করে অগ্রিম আয়কর আরোপ করা হলে সেটি দ্বৈত চাপ তৈরি করবে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, করযোগ্য আয় না থাকলেও কেন তাদের কর দিতে হবে।

অন্যদিকে কর বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ বলছেন, উন্নত কর ব্যবস্থার জন্য সবাইকে ধীরে ধীরে করের আওতায় আনা প্রয়োজন। তবে সেটি যেন সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত বোঝা হয়ে না দাঁড়ায়, সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রস্তাব এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে আরও সময় লাগবে। আগামী জাতীয় বাজেটে বিষয়টি কীভাবে উপস্থাপন করা হয়, সেদিকেই এখন নজর সবার।

সব মিলিয়ে মোটরসাইকেলের ওপর সম্ভাব্য অগ্রিম আয়কর আরোপের পরিকল্পনা দেশের কর ব্যবস্থা, রাজস্ব নীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সরকার একদিকে করের আওতা বাড়াতে চাইছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ বাড়তি আর্থিক চাপের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছেন। এখন দেখার বিষয়, শেষ পর্যন্ত কী ধরনের সিদ্ধান্ত আসে এবং সেটি সাধারণ মানুষের জন্য কতটা গ্রহণযোগ্য হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত