প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মাদারীপুর-শরীয়তপুর আঞ্চলিক সড়কে গভীর রাতে গাছ কেটে সড়কে ফেলে গরুবোঝাই চারটি ট্রাকে ডাকাতির ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে পরিবহন শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে। দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে সংঘটিত দুঃসাহসিক এ ঘটনায় আবারও প্রশ্ন উঠেছে মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে। রাতের অন্ধকারে সংঘবদ্ধ ডাকাত দল যেভাবে পরিকল্পিতভাবে ট্রাকের গতিরোধ করে লুটপাট চালিয়েছে, তা স্থানীয়দের মাঝেও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
সোমবার দিবাগত রাত প্রায় ৩টার দিকে শরীয়তপুরের কাশিপুর হিন্দুপাড়া এলাকায় ঘটনাটি ঘটে। ভুক্তভোগী চালক, ব্যবসায়ী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, যশোর ও ঝিনাইদহ থেকে গরুবোঝাই চারটি ট্রাক শরীয়তপুর সড়ক হয়ে চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুরের দিকে যাচ্ছিল। দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার সঙ্গে চট্টগ্রাম অঞ্চলের যোগাযোগ সহজ হওয়ায় এই সড়কটি পণ্য পরিবহনের জন্য এখন বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেই সুযোগকেই কাজে লাগিয়েছে সংঘবদ্ধ ডাকাতচক্র।
চালকদের ভাষ্য অনুযায়ী, গভীর রাতে ট্রাকগুলো যখন কাশিপুর এলাকায় পৌঁছায়, তখন সড়কের ওপর হঠাৎ বড় একটি গাছ পড়ে থাকতে দেখা যায়। প্রথমে অনেকেই ভেবেছিলেন হয়তো ঝড় বা দুর্ঘটনায় গাছটি পড়ে গেছে। কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই আশপাশ থেকে দেশীয় অস্ত্র হাতে কয়েকজন দুর্বৃত্ত বেরিয়ে আসে। মুহূর্তের মধ্যেই তারা ট্রাকগুলোর চারপাশ ঘিরে ফেলে।
ভুক্তভোগী ট্রাকচালক মোহাম্মদ কামাল বলেন, দূর থেকে পুলিশের আলোর মতো সংকেত দেখে তারা গাড়ির গতি কমান। পরে কাছে গিয়ে দেখেন সড়কের ওপর গাছ কেটে ফেলে রাখা হয়েছে। তখনই ডাকাতরা হামলা চালায়। তারা ট্রাকের কাঁচ ভেঙে ফেলে, চালকদের গলায় অস্ত্র ধরে নগদ টাকা, মোবাইল ফোন এবং অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেয়। ঘটনার সময় তারা এতটাই আতঙ্কিত ছিলেন যে প্রতিরোধের সুযোগ পাননি।
আরেক চালক মিলন বলেন, ডাকাতরা খুবই হিংস্র আচরণ করছিল। তারা গাড়ির গতিরোধ করেই কোপানো শুরু করে। চালক ও ব্যবসায়ীদের কাছে থাকা সব টাকা নিয়ে যায়। এমনকি পরে চা খাওয়ার মতো টাকাও তাদের হাতে ছিল না বলে জানান তিনি। তার কণ্ঠে তখনও ভয় আর আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট ছিল।
স্থানীয়দের মতে, গভীর রাতে এ ধরনের ডাকাতির ঘটনা নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে গাছ ফেলে সড়ক অবরোধ করে ডাকাতির প্রবণতা আবারও বেড়েছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় রাতে যানবাহন কম চলাচল করে এবং পুলিশি টহল তুলনামূলক দুর্বল থাকে, সেসব এলাকাকেই টার্গেট করছে অপরাধীরা।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সময় একটি টহল দল ওই এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় ডাকাতরা দ্রুত পালিয়ে যায়। তবে পালানোর আগে তারা ট্রাকচালক ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নগদ অর্থ ও মোবাইল ফোন লুট করে নেয়। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং জড়িতদের শনাক্তে কাজ শুরু করেছে।
শরীয়তপুরের স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন শত শত পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল করে। বিশেষ করে গরু, মাছ, সবজি এবং অন্যান্য কৃষিপণ্য পরিবহনে রাস্তাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু রাতের বেলায় নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক চালক এখন ভয়ে থাকেন। অনেকেই অভিযোগ করছেন, নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় প্রায়ই ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা ঘটলেও স্থায়ী সমাধান দেখা যাচ্ছে না।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রাতের সড়কপথে ডাকাতি নতুন উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে কোরবানির ঈদ সামনে এলে গরুবাহী ট্রাকগুলোকে টার্গেট করে অপরাধচক্র আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। কারণ এসব ট্রাকে সাধারণত ব্যবসায়ীরা নগদ অর্থ বহন করেন এবং দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হয়।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র এখন অনেক বেশি পরিকল্পিতভাবে কাজ করছে। তারা আগে থেকেই সড়কের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এবং কোথায় টহল কম থাকে তা জেনে নেয়। এরপর গভীর রাতে সড়ক অবরোধ করে দ্রুত লুটপাট চালিয়ে পালিয়ে যায়। ফলে তাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এদিকে এই ঘটনার পর স্থানীয় পরিবহন শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকে বলছেন, জীবিকার তাগিদে রাতেই পণ্য পরিবহন করতে হয়। কিন্তু এভাবে যদি নিরাপত্তাহীনতা বাড়তে থাকে, তাহলে ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়বে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘটনাটি নিয়ে আলোচনা চলছে। অনেকেই রাতের সড়ক নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন। কেউ কেউ বলছেন, মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে পুলিশের টহল বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নজরদারি ক্যামেরা স্থাপনের দাবিও তুলেছেন অনেকে।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডাকাতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ এবং স্থানীয় তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে পরিবহন শ্রমিকদেরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে মাদারীপুর-শরীয়তপুর আঞ্চলিক সড়কে গাছ ফেলে গরুবাহী ট্রাকে দুঃসাহসিক ডাকাতির এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে, দেশের বিভিন্ন সড়কে রাতের নিরাপত্তা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। সাধারণ চালক ও ব্যবসায়ীরা চাইছেন, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক যাতে তারা অন্তত জীবিকার পথে নিরাপদে চলাচল করতে পারেন।