প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে সরকার। দীর্ঘদিন ধরে অনুসরণ করা পাঁচ বছর মেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার কাঠামো থেকে সরে এসে এবার একটি নতুন কৌশলগত রূপকল্পের দিকে এগোচ্ছে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকেরা। এই নতুন পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় লক্ষ্য হচ্ছে আগামী এক দশকের মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের স্তরে উন্নীত করা এবং ধারাবাহিক উচ্চ প্রবৃদ্ধির পথে অর্থনীতিকে পুনরায় স্থিতিশীল করা।
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে এই রূপান্তর পরিকল্পনার প্রথম ধাপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সেখানে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। সরকার মনে করছে, কাঠামোগত সংস্কার, মেগা প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়ন এবং রপ্তানি খাতের বহুমুখীকরণের মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে।
তবে সরকারের এই উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন সামষ্টিক অর্থনীতির বেশ কিছু সূচক নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস এবং বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে ব্যবধান বাড়ছে বলে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে চাপ, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং ব্যাংক খাতের তারল্য ঘাটতি অর্থনীতির গতি মন্থর করে দিচ্ছে।
চলতি বাজেটে প্রথমে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হলেও সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। সরকারি পর্যবেক্ষণেও দেখা যাচ্ছে, শিল্প ও সেবা খাতে প্রত্যাশিত গতি না থাকায় প্রবৃদ্ধির চাপ তৈরি হয়েছে। জ্বালানি সংকট, কাঁচামাল আমদানিতে জটিলতা এবং বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে উৎপাদন খাত কাঙ্ক্ষিতভাবে এগোতে পারছে না।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস আরও সতর্ক। বিশ্বব্যাংক চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে বলে জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফের পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৭ শতাংশের কাছাকাছি। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকও একই ধরনের শ্লথ প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত দিয়েছে। তাদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক রিজার্ভের ওপর চাপ এবং দুর্বল রাজস্ব আদায় বেসরকারি বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়তে হলে প্রতিবছর গড়ে ৬ থেকে ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হবে। সেই লক্ষ্যেই নতুন রূপকল্প তৈরি করা হয়েছে। সরকার কৃষি খাতের আধুনিকায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং রপ্তানি খাত সম্প্রসারণকে প্রধান কৌশল হিসেবে নিচ্ছে।
তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, কেবল লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের একজন জ্যেষ্ঠ ফেলো মন্তব্য করেছেন, উচ্চ প্রবৃদ্ধির স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য বিনিয়োগের হার জিডিপির অন্তত ৩২ থেকে ৩৩ শতাংশে উন্নীত করতে হবে, যেখানে বর্তমানে তা ২৭ থেকে ২৮ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। তার মতে, কাঠামোগত সংস্কার, ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা এবং সুশাসন ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
অন্যদিকে সাবেক অর্থসচিবের মতে, বাজেটে উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা হতে পারে। তবে প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো প্রবৃদ্ধির গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং তার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা তৈরি করা।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি রূপান্তরকালীন পর্যায়ে রয়েছে। একদিকে দ্রুত উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন রূপকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে শুধু বড় লক্ষ্য নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন কাঠামো।
সব মিলিয়ে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন এখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দুতে। তবে এই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে হলে নীতি, বিনিয়োগ এবং সুশাসনের সমন্বিত অগ্রগতি ছাড়া বিকল্প নেই—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা।