প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। সীমান্ত অঞ্চলে পাল্টাপাল্টি ড্রোন হামলা, পারমাণবিক মহড়া এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উত্তেজনার মধ্যে আবারও রক্তাক্ত হলো দুই দেশ। সর্বশেষ রাশিয়ার ব্রিয়ানস্ক সীমান্ত অঞ্চলে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় তিন রেলকর্মী নিহত হয়েছেন। একই সময়ে ইউক্রেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর সুমিতে রুশ বাহিনীর পাল্টা হামলায় শিশুসহ অন্তত ছয়জন আহত হয়েছেন। যুদ্ধের দীর্ঘ এই অধ্যায়ে নতুন করে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তায় ডুবে গেছে সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোর সাধারণ মানুষ।
স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার রাতে রাশিয়ার ব্রিয়ানস্ক অঞ্চলে হামলার ঘটনা ঘটে। স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, ইউক্রেনীয় ড্রোন একটি ট্রেনের ইঞ্জিনে আঘাত হানে। বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই নিহত হন তিন রেলকর্মী। আহত হন আরও কয়েকজন। হামলার পর এলাকায় জরুরি অবস্থা জারি করা হয় এবং রেল চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আহতদের হাসপাতালে নেওয়ার কাজ শুরু করেন।
রুশ কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, ইউক্রেন পরিকল্পিতভাবে সীমান্ত অঞ্চলের বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। তাদের দাবি, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ড্রোন হামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে রেললাইন, জ্বালানি ডিপো এবং সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনের পথগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা বাড়ানো হয়েছে।
অন্যদিকে ইউক্রেনের সুমি শহরেও ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রুশ বাহিনীর হামলায় অন্তত ছয়জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে শিশু রয়েছে। বিস্ফোরণে আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
যুদ্ধের এই নতুন ধাপে ড্রোন প্রযুক্তি দুই পক্ষের জন্যই বড় অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। ইউক্রেনের বিমান বাহিনী জানিয়েছে, রাতভর রাশিয়া দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ১১৬টি ড্রোন ছুড়েছে। ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেক ড্রোন ভূপাতিত করলেও কিছু ড্রোন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে আঘাত হানে।
ড্রোন হামলার প্রভাব এখন শুধু রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। বাল্টিক অঞ্চলেও নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়ছে। লিথুয়ানিয়া ও লাটভিয়া নিজেদের আকাশসীমায় সন্দেহজনক ড্রোন শনাক্ত করার পর সতর্কতা জারি করেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ন্যাটো যুদ্ধবিমান দ্রুত আকাশে পাঠায়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কিয়েভের দাবি, রাশিয়ার ইলেকট্রনিক জ্যামিংয়ের কারণে অনেক ড্রোন দিক হারিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর আকাশসীমায় প্রবেশ করছে। যদিও মস্কো এই অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই এর প্রভাব সীমান্ত ছাড়িয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
এদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি নতুন করে সতর্কবার্তা দিয়েছেন বেলারুশকে। বৃহস্পতিবার এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, মস্কোর সঙ্গে যৌথ কোনো আগ্রাসী পদক্ষেপ নিলে তার পরিণতি ভয়াবহ হবে। জেলেনস্কির এই বক্তব্য এমন সময়ে এলো, যখন রাশিয়া ও বেলারুশ যৌথ পারমাণবিক মহড়া চালাচ্ছে।
ইউক্রেনের আশঙ্কা, এই মহড়া ভবিষ্যতে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের প্রস্তুতির অংশ হতে পারে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকায় রুশ সেনা ও অস্ত্র মোতায়েন বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
অন্যদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্দার লুকাশেঙ্কোর সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে অংশ নিয়ে বলেন, রাশিয়া-বেলারুশের যৌথ পারমাণবিক সক্ষমতা বর্তমান বৈশ্বিক উত্তেজনার মধ্যে “ইউনিয়ন স্টেটের সার্বভৌমত্বের নির্ভরযোগ্য গ্যারান্টর” হিসেবে কাজ করবে।
পুতিনের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থল, সমুদ্র ও আকাশভিত্তিক পারমাণবিক শক্তির সমন্বয় দুই দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করেছে। তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে নতুন ধরনের হুমকি তৈরি হয়েছে এবং সেই হুমকি মোকাবিলায় রাশিয়া ও বেলারুশ একসঙ্গে কাজ করছে।
তবে আলেক্সান্দার লুকাশেঙ্কো দাবি করেছেন, এই যৌথ মহড়া কারও বিরুদ্ধে নয়। তার মতে, এটি দুই দেশের নিয়মিত সামরিক সমন্বয়ের অংশমাত্র। কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলো বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছে। তাদের আশঙ্কা, রাশিয়া যুদ্ধের চাপ বাড়াতে পারমাণবিক সক্ষমতাকে কৌশলগত বার্তা হিসেবে ব্যবহার করছে।
মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চলা এই মহড়ায় অংশ নিয়েছে কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী, উত্তর ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহর, দূরপাল্লার বিমান বাহিনী এবং বিভিন্ন সামরিক ইউনিট। রুশ কর্তৃপক্ষের দাবি, সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে বড় পারমাণবিক মহড়াগুলোর একটি, যেখানে প্রায় ৬৪ হাজার সেনা অংশ নিয়েছে।
এই মহড়াকে ঘিরে ন্যাটো মিত্রদের মধ্যেও উদ্বেগ বেড়েছে। পশ্চিমা বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি পারমাণবিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে রাশিয়া আন্তর্জাতিক মহলে শক্ত অবস্থান জানান দিতে চাইছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, যুদ্ধের দীর্ঘায়িত এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। সীমান্ত অঞ্চলের বাসিন্দারা প্রতিদিন আতঙ্ক নিয়ে জীবন কাটাচ্ছেন। শিশুদের শিক্ষা ব্যাহত হচ্ছে, হাসপাতাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, আর লাখো মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন।
বিশ্ব রাজনীতির পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ নয়, বরং বৃহত্তর ইউরোপীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্যও বড় সংকেত। ড্রোন যুদ্ধ, পারমাণবিক মহড়া এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা যদি আরও বাড়ে, তাহলে এর প্রভাব গোটা বিশ্বের নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।
যুদ্ধের তৃতীয় বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো শান্তির কোনো সুস্পষ্ট পথ দেখা যাচ্ছে না। বরং প্রতিদিন নতুন হামলা, নতুন হুমকি এবং নতুন উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। আর সেই বাস্তবতায় সাধারণ মানুষের জীবন হয়ে উঠছে আরও অনিশ্চিত ও ভয়াবহ।