স্পেনে বিক্ষোভের ঝড়, চাপে সানচেজ সরকার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৪ মে, ২০২৬
  • ১০ বার
স্পেনে বিক্ষোভের ঝড়, চাপে সানচেজ সরকার

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক অঙ্গন। দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগকে কেন্দ্র করে দেশটির প্রধানমন্ত্রী Pedro Sánchez–এর পদত্যাগ দাবিতে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমেছে। শনিবার স্থানীয় সময় অনুষ্ঠিত এ বিক্ষোভ শুধু একটি রাজনৈতিক সমাবেশেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি স্পেনের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট, জনঅসন্তোষ এবং ক্রমবর্ধমান মেরুকরণের এক প্রতীকী বহিঃপ্রকাশ হয়ে উঠেছে।

মাদ্রিদের কেন্দ্রীয় সড়কগুলো লাল-সোনালি স্প্যানিশ পতাকায় ভরে যায়। “সমাজতান্ত্রিক মাফিয়ার পতন চাই” এবং “স্পেনকে বাঁচাও” লেখা ব্যানার হাতে বিক্ষোভকারীরা সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। আয়োজক সংগঠন স্প্যানিশ সিভিল সোসাইটি অ্যাসোসিয়েশন এ কর্মসূচির নাম দেয় “মার্চ ফর ডিগনিটি”। আয়োজকদের দাবি, বর্তমান সরকার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে দুর্বল করছে এবং বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে।

বিক্ষোভের এক পর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে, যখন একদল মুখোশধারী প্রতিবাদকারী প্রধানমন্ত্রী সানচেজের সরকারি বাসভবন মনক্লোয়া প্যালেসের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে। পুলিশ তাদের বাধা দিলে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। স্প্যানিশ গণমাধ্যমের প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন বিক্ষোভকারী নিরাপত্তা ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করছেন এবং পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। এ ঘটনায় অন্তত সাতজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তিনজনকে গ্রেফতার করেছে এবং তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার অভিযোগ আনা হয়েছে।

যদিও পুরো সমাবেশ শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের সহিংসতায় রূপ নেয়নি, তবুও ঘটনাটি স্পেনের রাজনৈতিক অস্থিরতার নতুন মাত্রা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশটির বামপন্থি জোট সরকার নানা বিতর্ক ও অভিযোগে ক্রমেই চাপে পড়ছে।

এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একাধিক দুর্নীতি তদন্ত। সম্প্রতি স্পেনের একটি আদালত সাবেক সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী José Luis Rodríguez Zapatero–এর বিরুদ্ধে প্রভাব খাটানো এবং অর্থপাচার চক্র পরিচালনার অভিযোগে তদন্তের ঘোষণা দেয়। যদিও জাপাতেরো এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন, তবুও বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। কারণ তিনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সানচেজের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্র এবং স্পেনের সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী মুখ।

বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধী দলগুলো এই তদন্তকে সরকারবিরোধী জনমত আরও জোরালো করার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে। বিশেষ করে রক্ষণশীল Alberto Núñez Feijóo–এর নেতৃত্বাধীন পিপলস পার্টি এবং কট্টর ডানপন্থি Santiago Abascal–এর ভক্স পার্টি সানচেজ সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। উভয় দলের নেতারাই শনিবারের বিক্ষোভে অংশ নেন এবং সরকারের বিরুদ্ধে “নৈতিক দেউলিয়াত্ব” ও “রাষ্ট্রযন্ত্রকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার” করার অভিযোগ তোলেন।

স্পেনের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত বিতর্কগুলোর একটি ছিল প্রধানমন্ত্রী সানচেজের স্ত্রী Begoña Gómez–কে ঘিরে। ২০২৪ সালে তার বিরুদ্ধে প্রভাব খাটানো ও অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগে তদন্ত শুরু হলে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। সে সময় প্রধানমন্ত্রী সানচেজ কয়েকদিনের জন্য জনসম্মুখ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন এবং পদত্যাগের বিষয়টিও বিবেচনা করেন। পরে এক আবেগঘন ভাষণে তিনি বলেন, তার পরিবার রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার এবং কট্টর ডানপন্থি গোষ্ঠী বিচারব্যবস্থাকে ব্যবহার করে সরকারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।

সানচেজের সমর্থকদের দাবি, বর্তমান পরিস্থিতি মূলত রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফল। তাদের মতে, স্পেনে বামপন্থি সরকারের সংস্কারমূলক নীতির বিরোধিতা করতেই রক্ষণশীল ও ডানপন্থি গোষ্ঠীগুলো বিচারব্যবস্থা ও জনমতকে ব্যবহার করছে। তারা অভিযোগ করেন, বিরোধীরা সরকারের বিরুদ্ধে “দুর্নীতির আখ্যান” তৈরি করে রাজনৈতিক সুবিধা নিতে চাইছে।

অন্যদিকে বিরোধীদের বক্তব্য একেবারেই ভিন্ন। তারা বলছে, সানচেজ সরকার দীর্ঘদিন ধরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন এড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে বিচার বিভাগ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং প্রশাসনিক নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছে। তাদের দাবি, জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের একমাত্র পথ হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ এবং দ্রুত নির্বাচন আয়োজন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শনিবারের বিক্ষোভ স্পেনের জন্য শুধু একটি তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সংকেত নয়; বরং এটি ইউরোপজুড়ে বাড়তে থাকা রাজনৈতিক মেরুকরণেরও প্রতিফলন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক চাপ, অভিবাসন সংকট, সামাজিক বিভাজন এবং রাজনৈতিক অবিশ্বাসের কারণে ডানপন্থি দলগুলোর উত্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। স্পেনও সেই প্রবণতার বাইরে নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সানচেজ সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জনআস্থা ধরে রাখা। কারণ একদিকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চাপ, অন্যদিকে দুর্নীতির অভিযোগ ও রাজনৈতিক উত্তেজনা—দুই দিক থেকেই সরকার কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। যদি নতুন কোনো তদন্ত বা রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি সামনে আসে, তবে তা সরকারের জন্য আরও বড় সংকট তৈরি করতে পারে।

তবে এখন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী সানচেজ পদত্যাগের কোনো ইঙ্গিত দেননি। বরং তিনি তার রাজনৈতিক অবস্থান আরও দৃঢ় করার চেষ্টা করছেন। সরকারঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, সানচেজ বিশ্বাস করেন যে বিরোধীরা জনমনে আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি তৈরি করে রাজনৈতিক সুবিধা নিতে চাইছে এবং শেষ পর্যন্ত আইনি প্রক্রিয়াতেই সত্য প্রকাশ পাবে।

মাদ্রিদের শনিবারের বিক্ষোভ তাই শুধু একটি দিনের রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়; এটি স্পেনের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তার প্রতীক হয়ে উঠেছে। ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ক্ষমতাসীন সরকার ও বিরোধীদের এই সংঘাত আগামী মাসগুলোতে আরও তীব্র হতে পারে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত