নগদ লভ্যাংশে কঠোর নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশ ব্যাংকের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৪ মে, ২০২৬
  • ১০ বার
নগদ লভ্যাংশে কঠোর নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশ ব্যাংকের

প্রকাশ: ২৪ মে  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা, মূলধন শক্তিশালীকরণ এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে নগদ লভ্যাংশ ঘোষণায় নতুন কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে যেসব ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ২ হাজার কোটি টাকার কম, তারা কোনোভাবেই নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা বা বিতরণ করতে পারবে না। একই সঙ্গে যোগ্য ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রেও নগদ লভ্যাংশ প্রদানে সীমা আরোপ করা হয়েছে।

শনিবার (২৩ মে) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুপারভাইজরি পলিসি অ্যান্ড কোঅর্ডিনেশন ডিপার্টমেন্ট (এসপিসিডি) থেকে এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করা হয়। এই নতুন নির্দেশনার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর লভ্যাংশ বিতরণ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নতুন নীতিমালায় বলা হয়েছে, ব্যাংক খাতের সার্বিক আর্থিক পরিস্থিতি, আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা, ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা এবং শেয়ারহোল্ডারদের রিটার্নের ভারসাম্য বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মূলত ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিওএস সার্কুলার নং-০১/২০২৫ অনুযায়ী লভ্যাংশ বিতরণ সংক্রান্ত নীতিমালা আরও কঠোর করা হয়েছে। সার্কুলারের ২(ক) অনুচ্ছেদে ব্যাংকগুলোর লভ্যাংশ দেওয়ার পূর্বশর্তগুলো উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে আর্থিক সক্ষমতা, মূলধন সংরক্ষণ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা মানদণ্ড পূরণের বিষয়গুলো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

অন্যদিকে ৩ নম্বর অনুচ্ছেদে ক্যাপিটাল কনজারভেশন বাফারসহ ন্যূনতম মূলধন সংরক্ষণ অনুপাতের ভিত্তিতে নগদ ও স্টক লভ্যাংশের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি সর্বোচ্চ ডিভিডেন্ড পেআউট রেশিও নিয়েও নতুন সীমা আরোপ করা হয়েছে, যা ব্যাংকগুলোর লভ্যাংশ বিতরণে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে।

নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো—যেসব ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ২ হাজার কোটি টাকার নিচে, তারা কোনো ধরনের নগদ লভ্যাংশ দিতে পারবে না। এসব ব্যাংক কেবল স্টক লভ্যাংশ দিতে পারবে কি না, তা নির্ভর করবে অন্যান্য শর্ত পূরণের ওপর। ফলে ছোট মূলধনের ব্যাংকগুলোকে এখন আরও বেশি মূলধন সংরক্ষণে মনোযোগ দিতে হবে।

এছাড়া যেসব ব্যাংক সব শর্ত পূরণ করে নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার যোগ্য হবে, তাদের ক্ষেত্রেও সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, তারা মোট ঘোষিত লভ্যাংশের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত নগদ আকারে বিতরণ করতে পারবে। বাকি অংশ স্টক লভ্যাংশ হিসেবে দিতে হবে। এর ফলে ব্যাংকগুলো তাদের মুনাফার একটি বড় অংশ পুনঃবিনিয়োগে রাখতে বাধ্য হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং অভ্যন্তরীণ আর্থিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যাংকগুলোর মূলধন ভিত্তি শক্তিশালী করা অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় অতিরিক্ত লভ্যাংশ বিতরণের কারণে ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা দুর্বল হয়ে পড়ে, যা পরবর্তীতে আমানতকারীদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত ব্যাংক খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বিশেষ করে দুর্বল মূলধনের ব্যাংকগুলো অতীতে অতিরিক্ত লভ্যাংশ দিয়ে নিজেদের আর্থিক অবস্থান দুর্বল করেছে বলে বিভিন্ন সময়ে সমালোচনা উঠেছে। নতুন নির্দেশনা সেই প্রবণতা কমাতে সহায়ক হবে।

এদিকে ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কিছু ব্যাংকার মনে করছেন, নগদ লভ্যাংশে সীমা আরোপের ফলে বিনিয়োগকারীদের স্বল্পমেয়াদি আয়ের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। তবে অন্যদিকে অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে এটি ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতা ও আস্থা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে।

নতুন সার্কুলারে আরও বলা হয়েছে, এই নির্দেশনা ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হওয়া অর্থবছর এবং পরবর্তী বছরগুলোর লভ্যাংশ ঘোষণার ক্ষেত্রে কার্যকর হবে। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোকে এখন থেকেই তাদের আর্থিক পরিকল্পনা নতুন নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাজাতে হবে।

এছাড়া ২০২৫ সালের ১৩ মার্চ জারি করা পূর্ববর্তী ডিওএস সার্কুলার এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য নির্দেশনা অপরিবর্তিত থাকবে বলে জানানো হয়েছে। ফলে নতুন ও পুরোনো নীতিমালার সমন্বয়ে ব্যাংকগুলোর লভ্যাংশ বিতরণ কাঠামো আরও কঠোর পর্যবেক্ষণের আওতায় আসবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারা অনুযায়ী এই নির্দেশনা জারি করা হয়েছে এবং দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের কাছে এটি পাঠানো হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা আনতে এমন পদক্ষেপ সময়োপযোগী। কারণ ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা শুধু আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নয়, বরং পুরো অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আমানতকারীদের আস্থা ধরে রাখা এবং ঝুঁকি কমানো এই নীতির মূল উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তাদের মতে, ভবিষ্যতে যদি ব্যাংকগুলো এই নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করে, তাহলে দেশের ব্যাংক খাত আরও শক্তিশালী ও স্থিতিশীল ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত